সর্বশেষ সংবাদ
মৃত্যুর আগে পানি চেয়েও পায়নি কিশোর  » «   সিলেটে ৫৭৬ মণ্ডপে দুর্গাপূজা, থাকছে তিনস্তরের নিরাপত্তা  » «   জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগে গ্রেপ্তার ১১ জনের নাম প্রকাশ  » «   মানবতা বিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত সু চি-সেনাপ্রধান  » «   শাবির ভর্তি পরীক্ষা ১৮ নভেম্বর  » «   তিন ছেলে পুলিশ কর্মকর্তা, তবু ভিক্ষা করেন মা!  » «   চালের দামের লাগাম টানতে নিষেধাজ্ঞা উঠল প্লাস্টিকের বস্তা থেকে  » «   লিজে আনা বোয়িং ফেরতের উপায় খুঁজছে বিমান  » «   লন্ডনে পাতাল রেলে বিস্ফোরণ ‘সন্ত্রাসী হামলা’, আহত ১৮  » «   মহানগর কমিটির সভা: এসডিসির সদস্য আব্দুস শুকুর স্মরণে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত  » «   মিরতিংগা চা বাগানে মস্তকবিহিন লাশ উদ্ধার, আটক ২  » «   অভিনয় ছাড়ছেন মিশা সওদাগর  » «   লাউয়াছড়ায় গলায় ছুরি ধরে ট্রেনের দুই যাত্রীর টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনতাই  » «   মিয়ানমারে সাইবার হামলা চালিয়েছে বাংলাদেশি হ্যাকার গ্রুপ  » «   রাখাইনে সহিংসতায় দায়ী পাকিস্তান ও আইএসআই  » «  

এই বিরোধ ও বিতর্কে নেপোয় যেন দই না খায়



29আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী:ষোড়শ সংশোধনী সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের রায় নিয়ে সরকার ও বিচার বিভাগের মধ্যে যে বিরোধ তার একটা সাংবিধানিক সমাধান হওয়া প্রয়োজন। এ ব্যাপারে দেশের সব মহলেরই উদ্যোগী হওয়া দরকার ছিল। কারণ এটা কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়, সাংবিধানিক ইস্যু। এটা নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে শক্তি পরীক্ষারও ইস্যু নয়। আওয়ামী লীগের পরিবর্তে এখন যদি বিএনপি ক্ষমতায় থাকত, তাহলেও এই সংশোধনী নিয়ে আদালতের রায় সম্পর্কে কোনো বিতর্ক দেখা দিলে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতেই সেই বিতর্ক অবসানের জন্য দাবি উঠত। এটাকে রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়ে ‘মারি অরি পারি যে প্রকারে’ নীতি অনুসরণ করা হতো না। এটা আমার ধারণা।
কিন্তু এই বিতর্ক শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি এটাকে একটা রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়ে ও বিচার বিভাগের অতিদরদি সেজে হৈচৈ শুরু করে। সন্দেহ নেই, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিয়ে এই রায়ের সঙ্গে মহামান্য আদালত এমন একটা পর্যালোচনা যুক্ত করেছেন, যা বিএনপির মরা গাঙে বান এনে দিয়েছে এবং একটা রাজনৈতিক ইস্যু তৈরি করার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। সামনে একটা সাধারণ নির্বাচন। অথচ বিএনপির হাতে কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নেই, যা নিয়ে তারা সরকারবিরোধী আন্দোলনে নামতে পারে অথবা নির্বাচনী প্রচারণায় কাজে লাগাতে পারে।
বিএনপির হাতে এত দিন তাই কোনো রাজনৈতিক ইস্যু ছিল না। আন্দোলন করার মতো শক্তিও তাদের নেই। তারেক রহমান তো দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে। এখন তাঁর মা বেগম জিয়াও চিকিৎসার নামে বিদেশে গিয়ে বসবাস করছেন। তিনি কবে দেশে ফিরবেন তার ঠিকঠিকানা নেই। বিএনপির অবস্থা এখন ঝড়ে ভাঙা কাকের বাসার মতো। এ অবস্থায় হঠাৎ ষোড়শ সংশোধনী সম্পর্কিত রায়টি তাদের হাতে যেন আলাদিনের চেরাগ এনে দিয়েছে। তারা এ সরকারের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতের স্বাধীনতা ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ তুলেছে এবং তাকে সরকার পতনের আন্দোলনে পরিণত করার চেষ্টাও চালাচ্ছে।
প্রশ্ন হলো, তাতে ভবি ভুলবে কি? ষোড়শ সংশোধনী সংক্রান্ত বিশাল রায়টি ভালোভাবে পাঠ করার আগেই বিএনপির নেতানেত্রী ও আইনজীবীরা লাফ দিয়ে উঠেছিলেন, ভেবেছিলেন ‘মেঘ না চাইতেই জল। ’ এখন ধরা পড়েছে, এই রায়ের সঙ্গে যুক্ত প্রধান বিচারপতির ‘পর্যবেক্ষণে’ কিছু বিতর্কিত কথা আছে; কিন্তু তাতে বারবারই বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রের স্থপতি ও জাতির পিতা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা পিতা জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বলা হয়েছে ‘বর্বর সামরিক শাসক। ’ তাঁর সরকারকেও বলা হয়েছে অবৈধ সরকার।
সম্ভবত এটা জানার পরই বিএনপি নেতাদের এই রায় নিয়ে লম্ফঝম্প করা একটু কমেছে। তবে ‘কিল খেয়ে কিল হজম করা’র নির্লজ্জতা বিএনপির প্রচুর। তাদের প্রতিষ্ঠাতা নেতাকে রায়ে কী বলা হয়েছে, তা হজম করে ফেলে এটাকে কিভাবে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে হটানোর কাজে লাগানো যায় সে জন্য তারা মরিয়া হয়ে উঠেছে। মাতা-পুত্রও সেই লক্ষ্যে লন্ডনে বসে চরকি ঘোরাচ্ছেন। কিন্তু এই চক্রান্তও হালে পানি পাবে বলে মনে হয় না। তবে এটা সত্য, রাজনৈতিক ইস্যুবিহীন বিএনপির হাতে এই রায় একটা অস্ত্র জুগিয়েছে। তাদের মরা গাঙে একটু বান ডেকেছে।
কিন্তু এই বানের জলে বিএনপি আবার ভাসতে পারবে কি? তা মনে হয় না, জনগণের স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে পারে। কিন্তু এত দুর্বল নয় যে তারা সাম্প্রতিক অতীতের কথা এত শিগগির ভুলে যাবে। বিএনপি এখন প্রধান বিচারপতির মর্যাদার প্রশ্ন তুলেছে। মাত্র কয়েক বছর আগে তারা নিজেদের মনোনীত রাষ্ট্রপ্রধান ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে কী ধরনের অবমাননা ও অমর্যাদাকর আচরণ করেছিল? সব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই প্রধান বিচারপতি ও রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদাকে সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা হয়। তাঁরা রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ চালিকাশক্তি।
এ অবস্থায় রাষ্ট্রপতি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী বিএনপির মনোনীত রাষ্ট্রপতি হওয়া সত্ত্বেও তাঁর দল ও সরকারের কাছ থেকে কী আচরণ পেয়েছিলেন? তিনি কোনো বিতর্কমূলক উক্তিও করেননি। শুধু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলেন। এই ‘অপরাধে’ দলীয় সভায় তাঁর চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করে তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। বঙ্গভবন থেকে পুলিশবেষ্টিত অবস্থায় তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। পদত্যাগ করেও তিনি রক্ষা পাননি। মহাখালীর কাছে এক শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকালে বিএনপি সমর্থকরা তাঁর ওপর হামলা চালায়। তিনি রেললাইন ধরে দৌড়ে আত্মরক্ষা করেন। ঘটনাটি ঘটিয়েছিল যে দল, তারা এখন প্রধান বিচারপতির মর্যাদার নামে মায়াকান্না জুড়েছে। এই দলের প্রতিষ্ঠাতা নেতা জিয়াউর রহমান দেশে ক্যু ঘটিয়ে ক্ষমতা দখলের পর প্রধান বিচারপতি সায়েমকে এনে রাষ্ট্রপতি পদে বসিয়েছিলেন। আবার তাঁর বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করে নিজে রাষ্ট্রপতি হন (পড়ুন বিচারপতি সায়েমের আত্মকথা)।
হাসিনা সরকার যদি ষোড়শ সংশোধনী সংক্রান্ত রায় নিয়ে বিচার বিভাগের সঙ্গে বিবাদটি সঠিকভাবে হ্যান্ডেল করতে পারে, তাহলে বিএনপি যতই চেষ্টা করুক, এটিকে রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়ে মাঠ গরম করতে পারবে না। মাতা-পুত্রের লন্ডন ষড়যন্ত্রও সফল হবে না। আমার ভয় ও ধারণা, দেশের নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে এই বিরোধের একটা সুষ্ঠু সমাধান ঠেকিয়ে রাখতে চায় এবং পেছন থেকে নারদ মুনির ভূমিকা পালন করছে একটি মহল ও তাদের নেতা। তিনি একজন হতাশ রাজনীতিক এবং তাঁর হতাশা ও ঈর্ষা বহুকাল ধরে আওয়ামী লীগ ও হাসিনা-নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীভূত।
আওয়ামী লীগ রাজনীতির একটা বড় দুর্ভাগ্য, বঙ্গবন্ধু তাঁর যে রাজনৈতিক সহচর ও বন্ধুকে বিশ্বাসঘাতক জেনেও বারবার ক্ষমা করে নিজের পাশে এনে সম্মানের সঙ্গে বসিয়েছিলেন, তিনিই তাঁর হত্যাকাণ্ডে একটি প্রধান ভূমিকা নিয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর হত্যা, অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু হত্যা থেকে জাতীয় নেতাদের হত্যা—এই অব্যাহত হত্যাকাণ্ডে তাঁর ছিল অব্যাহত যোগাযোগ। এ জন্য তাঁকে কেউ কেউ ‘সিরিয়াল কিলার’ (Serial Killer) আখ্যা দিয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যার পরও আওয়ামী লীগ রাজনীতি এই দুর্ভাগ্য থেকে মুক্ত হয়নি। হাসিনা-নেতৃত্ব ও আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার জন্য আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের মধ্যেই শেখ হাসিনার উপদেষ্টা ও অভিভাবক সেজে এখন এক বর্ষীয়ান নেতা দেখা দেন, যাঁকে সিরিয়াল কন্সেপিরেটর বা ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তারকারী আখ্যা দিলে কিছু মাত্র অত্যুক্তি করা হয় না।
তাঁর ইচ্ছা ছিল বর্তমান বাংলার রাজনীতিতে তিনি বৈরাম খাঁ হবেন। অর্থাৎ সম্রাট আকবর বালক বয়সী থাকায় তাঁকে সিংহাসনে বসিয়ে এবং তাঁর অভিভাবক সেজে বৈরাম খাঁ মোগল সাম্রাজ্যের শাসনদণ্ড চালাবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু একটু বয়স হতেই আকবর বৈরাম খাঁর চালাকি বুঝতে পারেন এবং কৌশল করে তাঁকে হজে পাঠিয়ে দেন। বৈরাম খাঁ আর হজ থেকে ফেরেননি।
বর্তমান যুগে আওয়ামী লীগের এই বৈরাম খাঁও ভেবেছিলেন, রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন আর কতটা করতে পারবেন, তিনিই অভিভাবক সেজে মাথার ওপর বসে শাসনদণ্ড চালাবেন। তিনি বুঝতে পারেননি, শেখ হাসিনা তখন কম বয়সী নারী হলেও বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে কম রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেননি। ফলে এই আওয়ামী বৈরাম খাঁর মনের সাধ পূর্ণ হয়নি, তিনি আওয়ামী লীগ ছেড়ে যান। সেই থেকে হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তাঁর অবিরাম ষড়যন্ত্র। তাঁর চরিত্র হলো, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে গণতান্ত্রিক বিরোধিতায় অবতীর্ণ হওয়া নয়; তলে তলে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের পালে হাওয়া দেওয়া। সরকার ও বিচার বিভাগের বর্তমান বিরোধেও তাঁর ভূমিকাটি এখন আর খুব অস্পষ্ট নয়। তাঁর সমর্থক একটি ‘নিরপেক্ষ মিডিয়া গ্রুপে’ এখন নাকি খুব উল্লাস। এই গ্রুপের এক বকেয়া বামপন্থী সম্পাদক নাকি তাঁর স্টাফদের এই বলে সাহস জোগাচ্ছেন, এই সরকার আর দুই মাসও টিকবে না। তার পরই দেশে আসবে তাদের পছন্দের অনির্বাচিত ‘সুশীল সরকার’! (খবরটা হাওয়া থেকে পাওয়া)।
দেশ একটা দারুণ সংকটকাল পার করছে। আমার একটাই ভরসা, শেখ হাসিনা অসীম সাহস ও ধৈর্যের দ্বারা অনেক সংকট পার হয়েছেন। এই সংকটও তিনি পার হবেন। কারণ তাঁর সাফল্যের ওপর দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। বর্তমান প্রধান বিচারপতিকেও আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি। তিনিও কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেশের স্বার্থ ও কল্যাণকে সবার ঊর্ধ্বে স্থান দেবেন—এই বিশ্বাস আমার আছে। তিনি যেন কালনেমির লঙ্কাভাগের ষড়যন্ত্রে কোনোভাবেই ব্যবহৃত না হন, এটা আমার আন্তরিক প্রার্থনা।
যাঁরা আওয়ামী লীগের অতি শুভাকাঙ্ক্ষী সেজে প্রধান বিচারপতি পদটির মর্যাদার দিকে লক্ষ না রেখে লাগামহীন কথাবার্তা বলছেন, তাঁদের সংযত হতে বলি। ঈশান কোণে কালো মেঘ জমছে। তাঁরা এ সম্পর্কে সতর্ক হোন। তাহলেই ঘোলা জলে মাছ শিকারের চেষ্টা যারা করছে, তাদের চেষ্টা ব্যর্থ হবে। দেশটা বেঁচে যাবে।

Developed by: