সর্বশেষ সংবাদ
মৃত্যুর আগে পানি চেয়েও পায়নি কিশোর  » «   সিলেটে ৫৭৬ মণ্ডপে দুর্গাপূজা, থাকছে তিনস্তরের নিরাপত্তা  » «   জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগে গ্রেপ্তার ১১ জনের নাম প্রকাশ  » «   মানবতা বিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত সু চি-সেনাপ্রধান  » «   শাবির ভর্তি পরীক্ষা ১৮ নভেম্বর  » «   তিন ছেলে পুলিশ কর্মকর্তা, তবু ভিক্ষা করেন মা!  » «   চালের দামের লাগাম টানতে নিষেধাজ্ঞা উঠল প্লাস্টিকের বস্তা থেকে  » «   লিজে আনা বোয়িং ফেরতের উপায় খুঁজছে বিমান  » «   লন্ডনে পাতাল রেলে বিস্ফোরণ ‘সন্ত্রাসী হামলা’, আহত ১৮  » «   মহানগর কমিটির সভা: এসডিসির সদস্য আব্দুস শুকুর স্মরণে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত  » «   মিরতিংগা চা বাগানে মস্তকবিহিন লাশ উদ্ধার, আটক ২  » «   অভিনয় ছাড়ছেন মিশা সওদাগর  » «   লাউয়াছড়ায় গলায় ছুরি ধরে ট্রেনের দুই যাত্রীর টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনতাই  » «   মিয়ানমারে সাইবার হামলা চালিয়েছে বাংলাদেশি হ্যাকার গ্রুপ  » «   রাখাইনে সহিংসতায় দায়ী পাকিস্তান ও আইএসআই  » «  

কেন জাতিসমূহ ব্যর্থ?



newচার বছর আগে বইটি প্রকাশের পরই বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তুলেছিল। বইটির নাম কেন জাতিসমূহ ব্যর্থ। ‘হোয়াই নেশনস ফেইল? দি অরিজিনস অব পাওয়ার, প্রোসপারিটি অ্যান্ড প্রোভার্টি’। সেই পুরনো প্রশ্ন, মানুষ গরিব কেন? এটা তার নিয়তি নাকি অন্য কিছু? একই প্রশ্ন উঠেছে দেশ ও জাতির প্রশ্নে। কিছু দেশ ধনী, আর ধনী। তাদের টাকা পায়সা, ধনদৌলত শুধু বাড়ে আর বাড়ে। আর কিছু দেশ দরিদ্রই থেকে যায়। তার উন্নয়নের নামে কত রাজনীতি হয়, কিন্তু গরিবেরা গরিবই থেকে যায়। এটা কেন? কি তার কারণ?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুজেছেন, বিশ্বখ্যাত দুই অর্থনীতিবিদ এসিমগলু এবং রবিনসন। তাদের নজর এড়ায়নি দক্ষিণ এশিয়ার দরিদ্র পীড়িত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো।
১৯৭২ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কেনেথ জে এরো লিখেছেন, এসিমগলুু এবং রবিনসন এই বিতর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন যে, কেন একইরকম দেখতে রাষ্ট্রগুলো তাদের অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক উন্নয়নে এতটা বেশি মতপার্থক্য দেখিয়ে থাকে। কোনো সমাজের উন্মুক্ততা এবং বিশেষ করে সৃজনশীল ধ্বংসযজ্ঞকে স্বাগত জানাতে উন্মুক্ত থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে এটা থাকে সেখানেই দেখা যায়, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সেখানে আইনের শাসন চূড়ান্ত নিষ্পত্তিকারক হিসেবে প্রতিয়মান হয়। যেখানে দুয়ার বন্ধ থাকে, সেখানে আইনের শাসন বাসা বাঁধে না। উন্নয়ন কিছু সময় একটা চাকচিক্য এনে দিতে পারে। কিন্তু তা টিকে থাকার গ্যারান্টি থাকে না। দুই লেখক ঐতিহাসিক পরম্পরার আলোকে এই সত্যের চেহারা উন্মোচন করেছেন। সব শুনে আপনাদের চোখ কপালে উঠবে। ভাবতে বসবেন, তাহলে আমরা যে একদিনের গণতন্ত্র উৎসব করি, তার কী মানে। এই চর্চাও তো নানা টানাপোড়েনের মধ্যে থাকে। তাহলে একজীবনে সুখের মুখ দেখার ভরসা কী?
১৯৯২ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী গেরি এস বেকার লিখেছেন, লেখকদ্বয় দেখিয়েছেন, যখন দেশসমূহ তাদের সঠিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে গড়ার আগ্রহ দেখায়, তখন সেসব দেশে দেখা যায়, তারা একটি উন্মুক্ত বহুত্ববাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। তাদের সেই রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক উচ্চপদে আসীনের একটা প্রতিযোগিতা থাকে। থাকে একটি ব্যাপকভিত্তিক নির্বাচকম-লী বা ভোটার। তারা নবীন রাজনৈতিক নেতাদের গ্রহণে কোনো সংকোচ দেখায় না। বরং নতুন প্রজন্মকে স্বাগত জানাতে বরণ ডালা নিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুণে। গুম করে না।
২০১০ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী পিটার ডায়মন্ড লিখেছেন, একটা দেশের কখনো সমৃদ্ধি আসতে পারে না। কিন্তু যদি টেকসই সমৃদ্ধি অর্জন করা লক্ষ্য হয়ে থাকে, তাহলে সেখানে ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত দুটো শর্ত পূরণ করা অপরিহার্য। প্রথমত, একটি অংশগ্রহণমূলক বা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, যারা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দেবে।
দি এসেন্ট অব মানি বইয়ের লেখক নেইল ফার্গুসন লিখেছেন, যারা মনে করেন কোনো জাতির অর্থনীতির ভাগ্য তার ভৌগোলিক অবস্থা কিংবা সংস্কৃতি দ্বারা নির্দিষ্ট হয়ে থাকে, তাদের জন্য খারাপ সংবাদ এনেছেন ড্যারন এসিমগলু এবং জিম রবিনসন। তারা দেখিয়েছেন, মানুষের তৈরি করা প্রতিষ্ঠানগুলোই এসবের জন্য দায়ী। কোনো একটি দেশ দরিদ্র কি ধনী, তা তাদের ভূ-খ-গত অবস্থান কিংবা আমাদের পূর্ব পুরুষদের ধর্ম বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে না। দি এন্ড অব হিস্টরি অ্যান্ড লাস্ট ম্যান অ্যান্ড অরজিনস অব পলিটিক্যাল অর্ডারস বইয়ের লেখক ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা লিখেছেন, ‘কেন কিছু দেশ ধনী আর কিছু দরিদ্র। তা ভূগোল, রোগবালাই বা সংস্কৃতি নির্ধারণ করে না। এটা নির্ভর করে সংশি¬ষ্ট দেশগুলোর প্রতিষ্ঠানগুলোর চরিত্র ও তার রাজনীতি।’
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেট বৃটেন ও জার্মানির মতো দেশগুলো কেন ধনীই থাকছে। আর কেন সাব সাহারান আফ্রিকা, মধ্য আমেরিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে তাদের অবস্থার মধ্যে কেন এত তফাৎ? কেন একদিকের জনগণের বিপুল আয়। আর অন্যদিকের জনগণের নিম্ন আয়? জীবন মান এতটাই নিচু? এ বইটি তার উত্তর খুঁজেছে।
২০১২ সালে বইটি যখন প্রকাশিত হয়, মধ্যপ্রাচ্য তখন আরব বসন্তে কাঁপছে। যার সূচনা ঘটিয়েছিল তথাকথিত জেসমিন বিপ্ল¬ব। এই জেসমিন বিপ্ল¬বের সূচনায় ছিলেন একজন হকার। তার নাম মো. বোয়াজ্জি। সময়টা ২০১০ সালের ১৭ই ডিসেম্বর। তিনি প্রকাশ্যে রাস্তায় নিজেকে বলি দিয়েছিলেন। ২০১১ সালের ১৪ই জানুয়ারির মধ্যে প্রেসিডেন্ট বেন আলী, যিনি ১৯৮৭ সাল থেকে তিউনিসিয়া শাসন করছিলেন, তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। তিউনিসিয়ার অভিজাত শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈপ্ল¬বিক চিন্তা-চেতনা ও জনরোষ শক্তিশালী হচ্ছিল এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল।
মিশরে হোসনি মোবারক, যিনি প্রায় ৩০ বছর কঠোরভাবে দেশ চালিয়েছিলেন। ২০১১ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি তিনি উৎখাত হন। বাহরাইন, লিবিয়া, সিরিয়া এবং ইয়েমেনের শাসকদের ভাগ্য অনিশ্চিত, যখন এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তখন বইটির ভূমিকা লেখা হয়েছিল। ভূমিকায় লেখা হয়েছে, এসব দেশের অসন্তোষের বীজ তাদের দারিদ্র্যে নিহিত। মিশরীয় জনগণের আয়ের পরিমাণ হলো সেই পরিমাণ, যা কি না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের গড় আয়ের মাত্র ১২ শতাংশ। মিশরের ২০ শতাংশ মানুষ চরম দারিদ্র্যে জীবন-যাপন করছে। মার্কিন-মিশর আয়ের বৈষম্য আমরা দেখি যতটা বিরাট, ততটা কিন্তু অন্য অঞ্চলের দেশগুলোর আয়ের সঙ্গে যদি তুলনা করা হয়, তখন দেখব আরে এটা তো খুব বেশি কম নয়। এর থেকেও শোচনীয় অবস্থা আছে। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আয়ের সঙ্গে উত্তর কোরিয়া, সিয়েরা লিওন এবং জিম্বাবুয়ের পার্থক্য আসমান জমিনের। এসব দেশের অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যা দারিদ্র্যসীমায় বাস করে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় মিশর কেন এত বেশি দরিদ্র? কি ধরনের টানাপোড়েন মিশরীয় জনগণকে অধিকতর সম্পদশালী হতে নিরুৎসাহিত করেছে? নীল নদের দেশ মিশরের অতীত এত গৌরবউজ্জ্বল হলেও কেন তাদের কড়াই টগবগিয়ে ফুটছে? মিসরের দারিদ্র্য কি নির্মূলের অযোগ্য নাকি এটা দূর করা চলে? আমরা দেখব কি করে মিসরীয়রা নিজেদের সমস্যা নিয়ে ভাবছেন, কেন তারা হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন? কায়রোতে কর্মরত ২৪ বছর বয়সী হামেদ। একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কর্মরত। এই ভদ্রমহিলা তাহিরির স্কোয়ারের বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন।
‘আমরা দুর্নীতি, নিপীড়ন এবং খারাপ শিক্ষার যাতাকলে নিষ্পেষিত হচ্ছিলাম। আমরা এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে বাস করছি যা দুর্নীতিগ্রস্ত।’ তাহিরির স্মৃতিচারণ করলেন মোসাব আল শামি। ২০ বছর বয়সী এই যুবা ফার্মেসির ছাত্র। ‘আমি আশা করি বছর শেষে আমরা একটি নির্বাচিত সরকার পাব এবং তাতে সার্বজনীন স্বাধীনতার নীতির প্রতিফলন ঘটবে। আর আমরা দুর্নীতির পাঁক থেকে মুক্তি পাব।’
তাহিরির স্কোয়ারের বিক্ষোভকারীরা একটি কণ্ঠে বিক্ষোভ করেছিলেন। আর তা হলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে। সরকার যে জনগণকে তাদের পাবলিক সার্ভিস দিতে পারছিল না তার বিরুদ্ধে, সরকার যে সবার জন্য সমান সুবিধা দিতে পারছিল না, তার বিরুদ্ধে। তারা নিপীড়নের বিরুদ্ধে নির্দিষ্টভাবে মুখ খুলেছিলেন। রাজনৈতিক অধিকার যে তাদের কেড়ে নেয়া হয়েছিল, তার বিরুদ্ধেও তারা সোচ্চার হয়েছিলেন।
২০১১ সালের ১৩ই জানুয়ারি আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার পরিচালক আল বারাদি টুইটার বার্তায় লিখেছিলেন, ‘তিউনেসিয়া: নিপীড়ন+সামাজিক বিচারের অভাব=একটি টাইম বোমা। তিউনিসীয় ও মিসরীয় জনগণ দেখলেন তারা একটি সমস্যাকে অভিন্নভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছেন। তারা চিহ্নিত করতে পেরেছেন তাদের জীবনে কিসের অভিশাপ নেমে এসেছে। কেন তাদের সব থেকেও সংকটের মধ্যে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে? আর সেই কারণটি তারা সমস্বরে বলেছেন, আমরা অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছি। তার মৌলিক কারণ হলো সরকার আমাদের রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করেছে। এক পর্যায়ে দেখা গেল প্রতিবাদকারীরা পদ্ধতিগত ভাবে প্রতিবাদ করতে শুরু করেছেন। ওয়ায়েল খলিলই হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি প্রথম বারো দফা দাবি পোস্ট করেছিলেন। খলিল একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এবং ব্লগার। যারা ভাবেন, পরিবর্তনের জন্য ডাক দিতে হলে তাকে পেশাদার রাজনীতিক হতে হবে, তাদের চোখ খুলে দিয়েছেন খলিল। পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে হলে কোনো দলে আপনাকে অবশ্যই নাম লেখাতে হবে, বিশ্ব সেই সময় পার করে এসেছে। এখন ইন্টারনেটের যুগ। পল্টনের সমাবেশে বড় দলের মঞ্চে ভাষণ না দিলে আপনাকে কেউ চিনবে না, সেই যুগ বাসি হয়ে গেছে। এখন আছে সদা জাগ্রত ডিজিটাল মঞ্চ। খলিল কিন্তু ব্লগার হিসেবেই মিসরীয় গণআন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন। এই আন্দোলনের সবটারই ধরন ছিল একান্তভাবে রাজনৈতিক। ন্যূনতম মজুরির মতো কিছু ক্রান্তিকালীন দাবি ছিল, কিন্তু তা পরে বাস্তবায়ন করা হবে সেটাই সবার কাছে পরিষ্কার ছিল।
মিসরীয়দের যা পিছিয়ে রেখেছিল, তার মূল ছিল একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ও অকার্যকর রাষ্ট্র। হোসনি মোবারকের দীর্ঘ শাসনে সেখানে এমন একটি সমাজ গড়ে উঠেছিল, যেখানে মানুষ তাদের মেধা, অভিলাষ, উদ্ভাবনপটুতা এবং যে শিক্ষা তাদের প্রাপ্য ছিল তাতে ঘাটতি ছিল। একইসঙ্গে তাদের কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে উঠেছিল যে, তাদের সমস্যার মূলে রাজনীতি। সব ধরনের রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা, দৈনন্দিন জীবনে তারা যার মুখোমুখি হচ্ছিলেন, তার মূলে ছিল একটি বিশেষ অস্বাভাবিক অবস্থা। যেখানে একটি ক্ষুদ্র অভিজাত গোষ্ঠীর কাছে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়ে পড়েছিল। তারা দোহাই দিচ্ছিলেন তথাকথিত স্থিতিশীলতার। তারা দোহাই দিচ্ছিলেন প্রলম্বিত শাসনের। উন্নয়ন ও স্থিতি দীর্ঘমেয়াদি চাও? তাহলে দীর্ঘমেয়াদি শাসন দাও। এই যে শাসকের মন্ত্র।
আর জনগণ তাই সহজেই শনাক্ত করতে পারেন যে, তাদের জীবনের নানা স্তরে জগদ্দল পাথরের মতো যা চেপে বসেছে তার মূলে রয়েছে রাজনীতি। আর তাই তারা রাজনৈতিক পরিবর্তনের অঙ্গীকারাবদ্ধ হলেন। তারা সংকল্পবদ্ধ হলেন, এই ক্ষমতাপূজারী কোটারি গোষ্ঠীকে হটাতে হবে।
এভাবে তারা ঐক্যবদ্ধ হলেন যে, পরিবর্তন আনতেই হবে।
শুধু এই একটিই হয়ে উঠেছিল জনগণমন্ত্র। এমনটা কিন্তু মোটেই নয় যে, তাহিরির স্কোয়ারে যারা জড়ো হতে শুরু করেছিলেন, তারা আগে থেকে ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। তারা বিপ্লবী মন্ত্রে উদ্দীপ্ত ছিলেন। তারা কমিউনিস্ট কি ইসলামি কোনো সংগঠিত দলের দ্বারা নির্দিষ্টভাবে প্রভাবিত ছিলেন না। তাদের কোনো সংগঠনগত পূর্ব প্রস্তুতি ছিল না। সবটাই ছিল মন ও মননে। কোনো নির্দিষ্ট মতবাদ, যা অনেকের কাছে কোনো পরিবর্তন আনার জন্য পূর্বশর্ত মনে হয়, কারো মনে হয়, পরিবর্তনের জন্য কোনো একটি দলের আদর্শ দরকার, একটি দলের পতাকা কিংবা কোনো অভিজ্ঞ নেতৃত্ব দরকার, তা কিন্তু মোটেই নয়, যারা সেদিন জড়ো হয়েছিলেন তারা ছিলেন বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ। তারা শুধু একটি বিষয় বুঝেছিলেন, পরিবর্তন একটা আনতে হবে। আর সেটা হলো রাজনৈতিক পরিবর্তন। এছাড়া তাদের মধ্যে অন্য কোনো ঐক্যসূত্র ছিল না। যখন জানতে চাওয়া হবে মিসর গরিব কেন, অন্যান্য জাতি এগিয়ে যায়, মিসর কেন থমকে থাকে, তখন কিন্তু এর উত্তরে কোনো একটি নির্দিষ্ট উত্তর মেলে না। অধিকাংশ শিক্ষাবিদ এবং ভাস্যকার ভিন্ন ভিন্ন মতামত দিয়ে থাকেন। কিছু লোক গুরুত্ব আরোপ করেন যে, মিসরের দারিদ্র্য প্রধানত তার ভৌগোলিক অবস্থান দ্বারা মূল্যায়িত হওয়া দরকার। এর কারণ দেশটির বিস্তীর্ণ ভূখ- মরুভূমি, বৃষ্টিপাতের দারুণ অভাব, খরা লেগেই থাকে। তার মাটি ও জলবায়ু উৎপাদনশীল কৃষিকাজের জন্য মোটেই উপযোগী নয়। অন্য অনেকে আবার মিসরের সংস্কৃতিগত কারণসমূহকেও বাধা হিসেবে দেখেন। তারা মনে করেন সংস্কৃতিই তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে অন্তরায়। অনেকের মতে মিসরের সংস্কৃতিগত ও কর্মগত নৈতিকতার মধ্যে আপনি এমন কিছু উপাদান দেখতে পাবেন, যা তাদের নিজেদের নয়, বরং অন্যদের সমৃদ্ধির পথকে প্রশস্ত করার কাজে লাগে। আবার অর্থনৈতিক ও নীতি প্রণয়ন বিষয়ক প-িতদের মধ্যে এই ধারণাও প্রবল যে, মিসরের শাসকরা আসলে জানেন না যে দেশটিকে কোন পথে টেকসই উন্নয়নের পথে নিতে হবে? অতীতে তারা ভুল নীতির দ্বারা দেশকে পরিচালিত হতে দিয়েছেন। এই শাসকরা যদি সঠিক ও উপযুক্ত উপদেষ্টাদের দ্বারা সঠিক উপদেশ পেতেন, তাহলে তারা দেশকে সমৃদ্ধি দিতে পারতেন। এই প-িতরা যুক্তি দিয়েছেন যে, এই শাসকদের তাঁবেদাররা দেশকে এমনভাবে চালিত করেছে, যেখানে গোষ্ঠীগত স্বার্থ প্রাধান্য লাভ করেছে। একটি সেতু কি কালভার্ট তৈরি করা হবে, স্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে ঠিকাদার বাছাই পর্যন্ত সবটাতেই বিবেচনা ছিল ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ। সমাজের বা বৃহত্তর জনগণের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনায় নেয়া হয়নি। এই গোষ্ঠীর কাছে সবসময় অগ্রাধিকার পেয়েছে সেই সব স্বার্থরক্ষা, অথচ তাদের কাছে দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের বিষয় সর্বদা অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে।

Developed by: