সর্বশেষ সংবাদ
সাগরে লঘুচাপ, হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস  » «   লাউয়াছড়ায় অবমুক্ত করা হয়েছে বিরল প্রজাতির লেজের ‘মোল’  » «   লন্ড‌নে এসিড হামলায় দু‌টি চোখ হারা‌লেন বাংলা‌দেশী তরুন  » «   জাফলংয়ে মাটি চাপায় কিশোরী নিহত, আহত ৪  » «   ক্লিনিক আর ডায়গনাস্টিক সেন্টারে সড়কজুড়ে যানজট  » «   কমরেড আ ফ ম মাহবুবুল হক আর নেই  » «   গোলাপগঞ্জে তেলবাহী লেগুনায় আগুন  » «   পিলখানা হত্যাকাণ্ড : হাইকোর্টের রায় ২৬ নভেম্বর  » «   লোদীর বাসায় মেয়র আরিফ: বিরোধের অবসান!  » «   নগরীতেে কোনদিন কোথায় স্মার্ট কার্ড বিতরণ  » «   সৌদির বিরুদ্ধে লেবাননের যুদ্ধ ঘোষণা!  » «   বাংলাটিলায় সুন্দর আলীর লাশ উদ্ধার  » «   রান খরায় বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানরা!  » «   আফগানিস্তানে টেলিভিশন স্টেশনে হামলা  » «   অন্যের বায়োমেট্রিক তথ্যে সিম কিনছে অপরাধীরা  » «  

জঙ্গিবাদ ও উগ্রডানপন্থা কল্পিত দুঃখ থেকেই চরমপন্থা



xyzfজেসন বার্ক:এই সপ্তাহে ডজন ডজন বিশ্লেষক ও কর্মকর্তা টেবিলের সামনে জড়ো হয়ে কম্পিউটার ও ফোনের পর্দার ওপর হামলে পড়বেন। তাঁরা সমবয়সী দুই তরুণের বিরুদ্ধে তদন্ত করবেন, যদিও তাঁরা এসেছেন একেবারেই ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত থেকে। তাঁরা সবাই আজকের পৃথিবীর অতি জরুরি লক্ষ্য অর্জনের যোগসূত্র খুঁজবেন, আর সেটা হলো চরমপন্থার অনুধাবন।
একদল তদন্তকারী ২২ বছর বয়সী ইউনেস আবুইয়াকুবের পূর্বাপর জানার চেষ্টা করবেন, যিনি গত বৃহস্পতিবার বার্সেলোনায় পর্যটকদের মধ্যে গাড়ি ঢুকিয়ে ১৪ জনকে হত্যার সন্দেহভাজন আসামি। আর অন্যরা ২০ বছর বয়সী জিমস ফিল্ডসের ঠিকুজি খুঁজতে ব্যস্ত থাকবেন। যঁার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ১২ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের শার্লটসভিল শহরে নব্য নাৎসি ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের মিছিলে প্রতিবাদরত এক নারীকে হত্যা করেছেন।
আমাদের তাৎক্ষণিকভাবে সতর্কতা প্রয়োজন। ফিল্ডস ও আবুইয়াকুব ভিন্ন ভিন্ন মানুষ, যাঁরা সহিংসতা দেখাতে অনন্য ও বিপরীতধর্মী পথ বেছে নিয়েছেন। তাঁরা বেড়ে উঠেছেন হাজার হাজার মাইল দূরে, একদম নাটকীয়ভাবে ভিন্ন পরিবেশে।
আরও বৃহৎ পরিসরে বলা যায়, ডানপন্থী ও জিহাদি সহিংসতা দুটি ভিন্ন বিষয়। তাদের উভয়ের দৃষ্টিভঙ্গি ঘৃণ্য হলেও ভ্যানগার্ড আমেরিকা তো আর আইএস নয়, তাদের মধ্যে যোজন যোজন ব্যবধান। আর ফিল্ডস মোহাম্মদ আত্তাও নন, যিনি ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে বিমান ছিনতাই করে তিন হাজার মানুষ হত্যা করেন। এখন পর্যন্ত ডানপন্থী ওসামা বিন লাদেন বা আবুবকর আল-বাগদাদি নেই।
বিভিন্ন সমীক্ষায় ডানপন্থী ও ইসলামি জঙ্গিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে। তবে কট্টর হয়ে উঠলে তাদের মধ্যে কিছু অভিন্ন ব্যাপার দেখা যায়। একজন ব্যক্তি কীভাবে চরমপন্থী আদর্শে দীক্ষিত হয়, সেটা বোঝার জন্য অনেক গবেষণা হচ্ছে। জিহাদিদের জীবনে একটি অভিন্ন ব্যাপার দেখা গেছে সেটা হলো, পিতার দূরে বা অনুপস্থিত থাকা। আবার সাম্প্রতিক আরেকটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ডানপন্থীদের ক্ষেত্রে মায়ের সঙ্গে কঠিন সম্পর্ক থাকাটা একটা সাধারণ কারণ। এই ফিল্ডের মা দুবার জরুরি সেবা ডেকেছিলেন; কারণ সে তাঁকে হামলা করেছিল বা হুমকি দিয়েছিল। ইন্টারনেটের ভূমিকা তো আছেই। তবে যারা ইতিমধ্যে কোনো একটি উদ্দেশ্যে জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছে, তারা নব্য দীক্ষিতদের উৎসাহ খুব সহজেই সংহত করতে পারে। আদর্শগত পর্যায়ে এই দুই ঘরানার মধ্যে যথেষ্ট মিল আছে, যদি আপনি একবার দৃশ্যমান বৈপরীত্যের বাইরে যেতে পারেন।
আরেকটি অভিন্ন ব্যাপার হলো কর্তৃত্ব অস্বীকার করা, তা সে নির্বাচিত সরকার হোক বা সম্রাটের। ১৯৬০-এর দশকে আধুনিক জিহাদের রূপকার সাইয়িদ কুতুব বলেছেন, সরকার যদি আলোকিত ও বিশ্বাসীদের শাসনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেই সরকার উৎখাত করাই শ্রেয়। ডানপন্থীরাও সরকারকে তাদের কল্পিত সমাজের জন্য বিশ্বাসঘাতক মনে করে, যে সমাজ কখনো কখনো ‘বর্ণ’ ও কখনো বিশ্বাস দ্বারা গঠিত হয়। তো সেই সরকারকে কখনো প্রত্যাখ্যান করতে হবে, আবার কখনো প্রতিরোধ করতে হবে।
এরা উভয়েই বিশ্বাস করে, তাদের সমাজ অস্তিত্বের হুমকিতে পড়েছে। ফলে প্রতিরোধ করাটা তার দায় হয়ে ওঠে। জনসংখ্যার ভারসাম্যের ব্যাপারটা শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের ভীতির কারণ হয়ে উঠেছে। কারণ, ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শুমারি অনুসারে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশটির সংখ্যালঘুরা জনসংখ্যার অর্ধেক হয়ে উঠবে। শার্লটসভিলের প্রতিবাদকারীরা স্বস্তিকার চিহ্নের নিচে মিছিল করে স্লোগান দিয়েছে, ‘ইহুদিরা আমাদের জায়গা দখল করতে পারবে না।’
অন্যদিকে ইসলামপন্থীরা স্বতসিদ্ধভাবে ধরে নেয়, যুদ্ধংদেহী পশ্চিমা শক্তি গত এক হাজার বছরের বেশির ভাগ অংশজুড়ে মুসলমানদের শোষণ করছে। তো কীভাবে এই শক্তিকে সবচেয়ে ভালোভাবে মোকাবিলা করা যায়, তার সবচেয়ে ভালো তরিকা কী হতে পারে, তা নিয়ে ঐকমত্যও আছে।
১৯৮৩ সালে অতি ডানপন্থীরা যখন এফবিআইয়ের প্রবল চাপের মুখে পড়ে, তখন শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী লুইস বিম মার্কিন সরকারের বিরুদ্ধে ‘নেতাবিহীন প্রতিরোধের’ ডাক দেন। এই বিম ছিলেন কু ক্লুক্স ক্ল্যান ও আরিয়ান নেশনস গ্রুপের সদস্য, তিনি অনুসারীদের বলেছিলেন, ‘ছোট ছোট প্রতিরোধ বা এমনকি ব্যক্তি প্রতিরোধও…পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সরকারকে মোকাবিলা করতে পারে।’
এর ২০ বছরের বেশি সময় পর মুস্তফা সেটমরিয়ম নাসার, যিনি আবু মুসাব আল-সুরডি নামেই বেশি পরিচিত, তিনি এক চরমপন্থী ইসলামি ওয়েবসাইটে নতুন কৌশলের ছক আঁকেন। তাঁর নীতি ছিল এ রকম, ‘সংগঠন নয়, নীতি’। তিনি ব্যক্তি আক্রমণকারী ও সেলের চিন্তা করেছেন, যার দিকনির্দেশনা দেবে অনলাইনে প্রকাশিত নানা টেক্সট, যারা পৃথিবীময় হামলা করে বেড়াবে। শেষমেশ তারা উভয়েই ইতিহাসের বিকৃত রূপের ওপর নির্ভর করে।
স্পেনের ব্যাপারে বলতে হয়, ইসলামপন্থীদের এই দেশটি নিয়ে একধরনের আচ্ছন্নতা আছে। কারণ, আল-আন্দালুস বা আন্দালুসিয়া একসময় শতাব্দীকালব্যাপী ইসলামি সম্রাটের অধীনে ছিল। এরপর ১৪৯২ সালে খ্রিষ্টান রাজারা এটি পুনরায় দখল করে নেন। আল-আন্দালুস মুসলিম সাম্রাজ্যের ক্ষয়ের প্রতীক। যে সাম্রাজ্য গত ১ হাজার ৩০০ বছরের বেশির ভাগ সময় পশ্চিমা প্রতিপক্ষের তুলনায় অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও পরিশীলিত ছিল। এই হারানোর ধারণা থেকেই খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও উম্মাহর মর্যাদা পুনরুদ্ধারের চিন্তা এসেছে, আল-বাগদাদি একবার এ রকম বলেছিলেন।
এখন ডানপন্থীদের মধ্যে কি খিলাফতের সমকক্ষ কিছু আছে? এই কনফেডারেশনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মিল আছে। এটা শুধু ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে নয়, বর্তমান প্রকল্প হিসেবেও নয়, বরং বিশ্বাসঘাতকতার পৌরাণিক প্রতীক ও প্রত্যয় হিসেবে এই মিল দেখা যায়। এই বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে ডানপন্থী ও ইসলামি চরমপন্থীদের মধ্যকার বিপজ্জনক তুলনা থেকে। আইএস একটা ভাষ্য নির্মাণের চেষ্টা করছে, যার মাধ্যমে তারা নবপ্রতিষ্ঠিত ও হাতছাড়া হওয়া খিলাফত পুনরুদ্ধারের সশস্ত্র ডাক দেবে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এটা বেশ কাজে দেবে।
পরাজয় ও হারানোর ধারণা থেকে যে দুঃখ-দুর্দশার বোধ সৃষ্টি হয়, সেটাই চরমপন্থার মূল কারণ। ডানপন্থী-চরমপন্থীদের দ্বারা বিপদ ঘটার আশঙ্কা তখনই বেশি থাকে, যখন তারা দেখে ইতিহাস তাদের পক্ষ নেই। ডোনাল্ড ট্রাম্প চিরকাল হোয়াইট হাউসে থাকবেন না। নব্য নাৎসিদের এই বাড়বাড়ন্ত হওয়ার পরিস্থিতিও চিরকাল থাকবে না। যদিও আমরা এখনো সে জায়গায় যাইনি, আগামী কয়েক বছরে সেটা হয়তো হয়ে যাবে। তবে তার মানে এই নয় যে বিজয় দরজায় কড়া নাড়ছে, বরং কঠিনতম লড়াইটা তখনই শুরু করতে হবে।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন।
জেসন বার্ক: দ্য গার্ডিয়ান-এর আফ্রিকা প্রতিনিধি।

Developed by: