সর্বশেষ সংবাদ
ফেসবুক বন্ধের দাবি জানালেন এরশাদ  » «   বিয়ানীবাজারে সড়ক সংস্কারের দাবিতে অবরোধ  » «   সিলেটের ফুটপাত কাদের দখলে, নেপথ্যে কারা?  » «   নখের এই অর্ধচন্দ্র স্বাস্থ্যের যা ইঙ্গিত করে  » «   শাহজালাল রহ. মাজারে দুই শিশুকে রেখে ‘বাবা’ উধাও  » «   ট্রাম্পকে বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানালেন হাসিনা  » «   মৌলভীবাজারে কলেজছাত্রী হত্যা: পরিকল্পনায় ‘চার প্রেমিক’  » «   চাঁদার দাবিতে অশ্লীল ভিডিও ধারণ: তরুণীসহ ৫ যুবক আটক  » «   সিলেটে ২৯ লাখ টাকা চেক জালিয়াতির চেষ্টা পণ্ড, ২ প্রতারক আটক  » «   রমজান উপলক্ষে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মতবিনিময় সভা  » «   ছাতকে ৩১৯ বোতল ভারতীয় মদ উদ্ধার  » «   শাবি ছাত্রলীগের সভাপতি সহ তিন জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা  » «   বিশ্বনাথের হত্যা মামলার আসামি কিশোরগঞ্জ থেকে গ্রেফতার  » «   ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসকদের মানববন্ধন  » «   দেশে কত ধর্ষক?  » «  

পাথর কোয়ারিতে উপেক্ষিত শ্রমিক নিরাপত্তা



37611 প্রান্ত ডেস্ক : একসময় পাথরের জন্য বিখ্যাত ছিল সিলেট। দেশের চাহিদার বেশির ভাগ পাথরই উত্তোলিত হতো সিলেটের জাফলং, ভোলাগঞ্জ, লোভাছড়া, বিছনাকান্দি, শাহ আরেফিন টিলা, শ্রীপুর কোয়ারি থেকে।
তবে অপরিকল্পিত উত্তোলনের কারণে এসব কোয়ারিতে ফুরিয়ে এসেছে পাথরের মজুদ। এরই মধ্যে পরিবেশগত ক্ষতির কারণে কয়েকটি কোয়ারিতে পাথর উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছেন আদালত। তবু বন্ধ হয়নি পাথর উত্তোলন। গভীর গর্ত খুঁড়ে, টিলা কেটে চলছে পাথর উত্তোলন।
এভাবে পাথর উত্তোলনে একদিকে বেড়েছে নিষিদ্ধ যন্ত্রের ব্যবহার, অন্যদিকে শ্রমিকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে কর্মক্ষেত্র।
পাঁচ লক্ষাধিক শ্রমিক সিলেটের কোয়ারিগুলোতে কাজ করলেও উপেক্ষিত শ্রমিক নিরাপত্তা। শ্রমঘন এ খাতে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচিত না হওয়ায় ঘটছে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা। গত ২০ দিনে সিলেটের তিন কোয়ারিতে পাথর উত্তোলনকালে মাটিচাপায় মারা গেছেন অন্তত ১১ শ্রমিক। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাটি ঘটে গত ২৩ জানুয়ারি কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার শাহ আরেফিন টিলায়। পুলিশের ভাষ্য মতে, ওইদিন টিলা ধসে মারা যান পাঁচ শ্রমিক।
জেলা প্রশাসনের হিসাবে, গত ছয় মাসে শাহ আরেফিন টিলা ধসে মারা গেছেন ১৮ শ্রমিক। তবে স্থানীয়দের হিসেবে এ সংখ্যা আরো বেশি।
বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ এর ৭৮ এর ক ধারায় বলা হয়েছে, ‘প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ শ্রমিকগণের ব্যক্তিগত সুরক্ষা যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও ব্যবহার নিশ্চিত করা ব্যতীত কাউকে কর্মে নিয়োগ করিতে পারিবে না এবং এই বিষয়ে মালিক কর্তৃক নির্ধারিত পন্থায় একটি রেকর্ড বুক সংরক্ষণ করিতে হইবে।’

এ ধারায় বলা হয়, ‘কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের পেশাগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সেফটি নিশ্চিতকরণের জন্য প্রত্যেক শ্রমিককে কাজের ঝুঁকি সম্পর্কে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সচেতন করিতে হইবে।’

তবে সরেজমিন পাথর কোয়ারিগুলো ঘুরে দেখা গেছে, শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে একেবারেই উদাসীন পাথর ব্যবসায়ীরা। শ্রমিকদের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা নেই এসব কোয়ারিতে। মারা যাওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণও পান না শ্রমিকরা।

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহ জামাল আহমদ বলেন, পাথর কোয়ারিতে যারা শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন তারা নিতান্তই দরিদ্র। এমনিতে একজন দিনমজুর দৈনিক ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা পেয়ে থাকেন। কিন্তু পাথর উত্তোলনের জন্য প্রতিদিন তারা ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পান। বাড়তি টাকার আশায়ই তারা ঝুঁকিপূর্ণ এসব কাজ করে থাকেন। নিজেদের নিরাপত্তার ব্যাপারে তারাও সচেতন না। এ সুযোগ নেন পাথর ব্যবসায়ীরা।

সিলেট পাথর ব্যবসায়ী সমিতি সূত্রে জানা গেছে, সিলেটের বিভিন্ন পাথর কোয়ারিতে পাঁচ লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ করেন। তবে গত বছরের সেপ্টেম্বরে খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সিলেটের ভোলাগঞ্জ, জাফলং ও শাহ আরেফিন টিলায় পাথর উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। বৃহৎ কোয়ারিগুলো বন্ধ থাকায় পাথর উত্তোলনে নিযুক্ত শ্রমিকের সংখ্যা এখন অনেক কমে এসছে।

তবে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বন্ধ নেই কোয়ারিগুলো থেকে পাথর উত্তোলন। বরং নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চলছে উত্তোলন। অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের ফলে বেড়েছে ঝুঁকি।

সিলেটের সবচেয়ে বেশি পাথর কোয়ারি রয়েছে গোয়াইনঘাট উপজেলায়। এই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সালাহ উদ্দিন বলেন, পাথর কোয়ারির নীতিমালা অনুযায়ী সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলন করতে ১০ মিটার গভীর গর্ত করার নির্দেশনা আছে। কিন্তু অবৈধ যন্ত্র দিয়ে পাথর তুলতে তার চেয়ে বেশি গভীর গর্ত করা হয়। এছাড়া রাতে পাথর তোলা নিষিদ্ধ হলেও কিছু অসাধু পাথর ব্যবসায়ী তা মানছেন না। তারা শ্রমিক দিয়ে রাতেও পাথর তোলাচ্ছেন।

শাহ আরেফিন টিলায় পাথর উত্তোলনে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন হাবিবুর রহমান ও হায়দার আলী। তারা বলেন, যে ব্যবসায়ীরা আমাদের পাথর উত্তোলনে নিযুক্ত করেন, তারা আমাদের নিরাপত্তার দিকটি দেখেন না। কেবল টাকার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ কাজ করতে হয় আমাদের।

তবে এমন দাবির সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে ওই এলাকার পাথর ব্যবসায়ী জৈনউদ্দিন বলেন, শ্রমিকদের ঝুঁকির বিষয়টি শুরুতেই বলা হয়। তবু তারা অধিক রোজগারের আসায় এ কাজে যুক্ত হন।

তিনি বলেন, কাজে যুক্ত হওয়ার আগে শ্রমিকদের শর্ত দেয়া হয়, দুর্ঘটনার শিকার হলে কিংবা কারো প্রাণহানি হলেও কোনো অভিযোগ করা যাবে না। তারা এ শর্ত মেনেই পাথর উত্তোলনে নিযুক্ত হন।

শ্রম আইন-২০০৬ এর ৮০ (১) ধারায় বলা আছে, ‘যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, যাহাতে প্রাণহানি বা শারীরিক জখম হয়, অথবা যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে দুর্ঘটনাজনিত বিস্ফোরণ, প্রজ্জ্বলন, অগ্নিকাণ্ড সবেগে পানি প্রবেশ বা ধূম্র উদ্গীরণ ঘটে, তাহা হইলে মালিক পরিদর্শককে পরবর্তী দুই কর্মদিবসের মধ্যে তত্সম্পর্কে নোটিস মারফত অবহিত করিবেন।’

তবে পাথর ব্যবসায়ীরা এসব অনুসরণ করেন না বলে দাবি কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) নুরুল আমিনের। তিনি বলেন, পাথর কোয়ারিগুলো দুর্গম এলাকায় হওয়ায় পাথর উত্তোলন হচ্ছে কিনা, তা সবসময় তদারকি করা সম্ভব হয় না। আর দুর্ঘটনায় শ্রমিক মারা গেলেও ব্যবসায়ীরা আমাদের জানান না। বরং কিছু টাকা দিয়ে মরদেহ তাদের নিজ এলাকায় পাঠিয়ে দেন।

গত ২৩ জানুয়ারি শাহ আরেফিন টিলা ধসে পাঁচজন শ্রমিক মারা গেলেও ঘটনাস্থলে গিয়ে একটি মরদেহও পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, শ্রমিকরাও এ ব্যাপারে কিছু বলতে চান না। আমরা সম্প্রতি নিহত শ্রমিকদের বাড়িতে গিয়ে মামলা করার জন্য বলেছি। তারা তো মামলা করতে চান না, উল্টো থানায় এসে তাদের কোনো অভিযোগ নেই বলে মুছলেকা দিয়েছেন। নগদ কিছু টাকা পাওয়া ও ভয়ে এমনটি হতে পারে বলে মনে করেন এ পুলিশ কর্মকর্তারা।

শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, সিলেটের উপমহাপরিদর্শক আরিফুল ইসলাম বলেন, বেশির ভাগ কোয়ারিতে পাথর উত্তোলনই তো অবৈধ। তবু উত্তোলন হচ্ছে। এছাড়া কোয়ারিগুলোর কর্মপরিবেশ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

এসব ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকরা যাতে ক্ষতিপূরণ পান এবং শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় ও দায়ীদের শাস্তি হয়; এজন্য আমরা সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে শ্রম আদালতে মামলা করব।

আর সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এমাদউল্লাহ শহিদুল ইসলাম মনে করেন, পাথর ব্যবসার সঙ্গে প্রভাবশালী ও সরকারদলীয় লোকজন সম্পৃক্ত থাকায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয় না।

তিনি বলেন, পাথর তুলতে শ্রমিকদের জন্য নিরাপত্তামূলক কী কী ব্যবস্থা নিতে হবে, তা শ্রম আইনে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু শ্রম অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতায় মানা হয় না। এজন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনেরও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের নিয়োগদাতাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

Developed by: