সর্বশেষ সংবাদ
এ্যাকশনে পুননির্বাচিত আরিফ  » «   ঈদের আগে খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করেছে বিএনপি  » «   সমকাল সম্পাদককে শেষ শ্রদ্ধা  » «   অনবদ্য তামিম ইকবাল  » «   ওরা এখনো নজরকাড়া  » «   শাবিপ্রবি’র হল বন্ধ  » «   সিলেটে ২১ আগষ্ট থেকে ৫ দিন বন্ধ বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার রিচার্জ  » «   ইকুয়েডরে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত  » «   ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন হ্যাক করা অত্যন্ত সহজ!  » «   সারা’র রুপে মুগ্ধ সবাই  » «   আবারও সিলেটে অনুষ্ঠিত হবে বঙ্গবন্ধু কাপ  » «   সিলেটে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি  » «   প্রতিদ্বন্দ্বি যখন যমজ বোন  » «   বিএনপি নির্বাচন বানচালের চক্রান্ত করছে : কাদের  » «   পঁচাত্তরে যেমন ছিল বাংলাদেশ  » «  

ভল্টের ভূতের রূপকথা



6666666666666666666666
সাজেদুর রহমান
ছেলে : মা, রূপকথার গল্প কি সব সময় ‘এক দেশে এক রাজা ছিল’ দিয়ে শুরু হয়? মা : না, সবসময় না, এক দেশে এক ব্যাংক ছিল, যার ভল্টে স্বর্ণ রাখলে তামা হয়ে যেত। ছয় দরজার সিন্দুক। সেই সিন্দুকের পাহারায় থাকত ৭০ জন পুলিশ। মহানিরাপত্তা সেই এলাকায় রাজার ঠিক করে দেওয়া তিনজন ছাড়া কেউ ঢুকতে পারত না। এমনকি ওই ব্যাংকের প্রধানও না। তার পরেও সেখান থেকে মণকে মণ খাঁটি স্বর্ণ পাল্টে ভেজাল স্বর্ণ হয়ে যেত। সবাই বলত, নিশ্চয় এটা ভূতের কাণ্ড।
মানুষ গল্প শুনতে ভালোবাসে। বাচ্চারা রূপকথার গল্প শুনতে খুব ভালোবাসে। মায়েরা বাচ্চাদের ভূতের গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়ায়। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রাখা প্রায় এক টন স্বর্ণ কেলেঙ্কারি হলো এবং তার ব্যাখ্যা কর্তৃপক্ষ যা দিল তাতে এ যুগের মায়েরা রূপকথা গল্পের নতুন ধারা তৈরি করতেই পারে।
এক. বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রিজার্ভ চুরির কেলেঙ্কারির দাগ মুছতে না মুছতেই ভল্টে ভল্টে ভুতুড়ে কাণ্ড ঘটে গেল। জানা যায়, হারুনুর রশিদ নামের এক ভদ্রলোক ২০১৫ সালের একটি স্বর্ণের চাকতি এবং একটি স্বর্ণের রিং বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখেন। সাবধানতাবশত চাকতি ও রিংয়ে কালো প্রলেপ লাগিয়ে দেন। বাংলাদেশ ব্যাংকে পরীক্ষা করে বিশুদ্ধ স্বর্ণ হিসেবে গ্রহণ করে প্রত্যয়নপত্র দেয়। ভরসার জায়গা বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে এসব জমা করে নিশ্চিন্ত থাকার দুই বছর পর পরীক্ষা করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, যে স্বর্ণ এনবিআর ভল্টে দিয়েছিল সেগুলো বদলে গেছে! আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ব্যাপারটি এনবিআর বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরে আনলেও তারা কোনো ভ্রূক্ষেপ করেনি। ছয় মাস ধরে বিষয়টি চেপে রাখে সংস্থাটি। কিন্তু কয়েকদিন আগে পত্রিকায় খবরটি রকাশিত হলে বাংলাদেশ ব্যাংক তড়িঘড়ি করে সংবাদ সম্মেলন করে বলে, জহুরি ও শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর মাপজোখে ভুল করেছে। নথিভুক্ত করতে বাংলা-ইংরেজি লেখার কারণে ত্রুটি হতে পারে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো ত্রুটি নেই। পরিমাপের সময় বিশুদ্ধতার ক্ষেত্রে ৪০ লেখা হয়েছে ৮০ (ইরেজিতে শব্দ মনে করে)।
দুই. স্বর্ণের হেরফের কাণ্ডের যে ব্যাখ্যা দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা পেশাদারি একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে এমন দায়িত্বহীন উত্তর প্রত্যাশিত ছিল না। সামান্য পরিমাণ স্বর্ণের হিসাবের অঙ্ক যারা জানেন না, তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো কেন্দ্রীয় সংস্থায় চাকরি করেন কেন? এমন স্পর্শকাতর হিসেবে ‘ভুল’ হয়ে থাকলেও দায়িত্বপ্রাপ্তদের চোখে এতদিন পড়েনি, এটা দায়িত্বে ভয়ানক অবহেলা। যা অন্যায়। অর্থ মন্ত্রণালয় চাইলে কথিত সংবাদ সম্মলনের আগে অভিযুক্তদের জিজ্ঞাবাদের ব্যবস্থা করতে পারত। কারণ, স্বর্ণ জালিয়াতির তদন্ত কোনো প্রচারমাধ্যমের নিজস্ব, বা সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলেরই নয়। তদন্ত সরকারি আরেকটা সংস্থার। বাংলাদেশ ব্যাংকের লুটেরাদের আরেকটা অন্যায়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছে কথিত সংবাদ সম্মেলনের মধ্যদিয়ে। স্বর্ণ জালিয়াতির লুটপাটের পক্ষে কৌশলে সাফাই গাইবার সংবাদ সম্মেলনে আসলে ব্যাংকটির কর্মকর্তারা অন্যায়ের ‘বৈধতা’ চাইলেন। তাদের দাবি, ‘স্বর্ণ ঠিক আছে, হিসাবে ভুল’।
তিন. আমার জানা মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টের যে নিরাপত্তাব্যবস্থা তাতে অন্তত আমি এটা বিশ্বাস করি, তা ভেদ করা কঠিন। আর যদি কেউ ভেদ করেও থাকে তাহলে তাকে কোনো না কোনো জালে ধরা পড়তেই হবে। বাংলাদেশে ব্যাংকে ৭০ জন পুলিশের একটি কন্টিনজেন্ট রয়েছে যারা অন্য কোথাও পাহারায় যান না। তারা টাকশাল থেকে টাকাও আনতে যান না। তারা শুধু ভল্টেই সার্বক্ষণিক পাহারা দেয়। ভল্ট এলাকাকে বাংলাদেশে ব্যাংকের ভাষায় ‘মহানিরাপত্তা এলাকা’ বলা হয়। স্বর্ণের যে ভল্ট সেখানে ঢুকতে গেলে ছয় স্তরের নিরাপত্তা ও গেটকিপিং পার হতে হয়। শুরুতে পাঞ্চ কার্ড, তার পর কলাপসিবল গেট যেখানে দেহ তল্লাশি হবে। স্বর্ণ বা বুলিয়ন ভল্ট পর্যন্ত তিনটি ভল্টের দরজা রয়েছে। আর সেই ভল্টে আলাদা আলমারিগুলোর আলাদা আলাদা চাবি। ভল্টে ঢোকার অধিকার রয়েছে শুধু কারেন্সি অফিসার, জয়েন্ট ম্যানেজার বুলিয়ন (স্বর্ণ), জয়েন্ট ম্যানেজার ক্যাশ এবং ডিজিএম ক্যাশের। এখানে গভর্নর বা ডেপুটি গভর্নর এবং সরকারের অন্য কর্মকর্তারা, অননুমোদিত ব্যক্তিদের যাওয়ার কোনো অধিকার নেই।
চার. ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বাড়তি সুনাম ছিল এতদিন। কিন্তু একের পর এক কেলেঙ্কারির ঘটনা সামনে আসায় সেটি ক্রমশ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে। বোঝায় যাচ্ছে, অভ্যন্তরীণ সুশাসন ও তদারকির বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে সংস্থাটিতে। এর আগে রিজার্ভ কেলেঙ্কারির সময়ও ঘটনাটিও বাংলাদেশ ব্যাংক চেপে রাখে। বিদেশি পত্রিকার মাধ্যমে সরকারসহ দেশবাসী ঘটনাটি জানে। শত কোটি টাকার সবচেয়ে বড় ব্যাংক তহবিল লোপাটের ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারাই বেশি দায়ী বলে মনে করে ফিলিপিন্স সেন্ট্রাল ব্যাংক ও আরসিবিসি। রিজার্ভ কেলেঙ্কারির সুরাহা এখনো হয়নি। সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংকে সাংবাদিক প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছিল, যাতে অভ্যন্তরীণ খবর বাইরে না যায়। ভল্টের স্বর্ণের ক্ষেত্রে একই রকম চুপ থাকে বিবি। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হলে টনক নড়ে।
পাঁচ. এভাবে আর যা-ই হোক, কেলেঙ্কারি চাপা দিয়ে রাখা যায় না। এটি না করে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার এবং জনগণের আমানত রক্ষাসহ নিজস্ব দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হলেই তো আর এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি তাদের হতে হয় না। রিজার্ভ থেকে শুরু করে জমা স্বর্ণ প্রভৃতির স্বাধীন অডিট হওয়া জরুরি। তা ছাড়া বিভিন্ন সময়ে আটককৃত স্বর্ণও বিবির ভল্টে জমা রাখা হয়, সেগুলোর এখনকার অবস্থা কী, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কেননা পুরো আর্থিক খাতের অভিভাবক বাংলাদেশ ব্যাংক। যার ফলে আর্থিক খাতে দেউলিয়াত্বের প্রকাশ ঘটবে বৈকি। কাউকে রক্ষা করতে গিয়ে পুরো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ও সুনাম নষ্ট যেন না করা হয়। এতে বহির্বিশ্বে আমাদের আর্থিক খাত সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা ছড়িয়ে পড়বে, যা টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সহায়ক নয়।
সাজেদুর রহমান : সাংবাদিক
sajedurrahmanvp@gmail.com

Developed by: