সর্বশেষ সংবাদ
এ্যাকশনে পুননির্বাচিত আরিফ  » «   ঈদের আগে খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করেছে বিএনপি  » «   সমকাল সম্পাদককে শেষ শ্রদ্ধা  » «   অনবদ্য তামিম ইকবাল  » «   ওরা এখনো নজরকাড়া  » «   শাবিপ্রবি’র হল বন্ধ  » «   সিলেটে ২১ আগষ্ট থেকে ৫ দিন বন্ধ বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার রিচার্জ  » «   ইকুয়েডরে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত  » «   ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন হ্যাক করা অত্যন্ত সহজ!  » «   সারা’র রুপে মুগ্ধ সবাই  » «   আবারও সিলেটে অনুষ্ঠিত হবে বঙ্গবন্ধু কাপ  » «   সিলেটে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি  » «   প্রতিদ্বন্দ্বি যখন যমজ বোন  » «   বিএনপি নির্বাচন বানচালের চক্রান্ত করছে : কাদের  » «   পঁচাত্তরে যেমন ছিল বাংলাদেশ  » «  

প্রয়োজন জীবনমুখী মানবিক ও কারিগরি শিক্ষা



1491234958
ফারিহা হোসেন
অজির্ত শিক্ষা দিয়ে শিক্ষাথীর্রা পরবতীর্ সময়ে কমর্জীবনে গিয়ে যদি সঠিকভাবে দেশ, সমাজ উন্নয়নে অবদান রাখতে ব্যথর্ হয় তা হলে সেই শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে হবে এখন থেকেই।
একটি দেশ, একটি জাতির অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হলো শিক্ষা। এই বিচেনায় বলা হয়, ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড।’ অর্থাৎ একজন মানুষ যেমনি মেরুদÐ সোজা করে স্থির দাঁড়াতে পারেন, ঠিক তেমনি একটি জাতির ভিত্তিমূল, উন্নয়ন, অগ্রগতি, সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া নিভর্র করে শিক্ষার ওপর। যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত, সে জাতি তত বেশি উন্নত, সভ্য, অগ্রসর। শিক্ষা অজর্ন মানুষের জš§গত এবং মৌলিক অধিকারও বটে। আমাদের সংবিধানে মানুষের মৌলিক যে, পঁাচটি অধিকারের কথা বলা আছে তাতেও শিক্ষাতে স্থান দেয়া হয়েছে। শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সাবর্জনীন, অপরিহার্য্য, ব্যাপক ও বিস্তৃততর। একজন মানুষকে প্রকৃত মানবিক গুণাবলি, সামাজিক গুণাবলি সম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষার বিকল্প নেই। আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এবং ঐ সময় বলা হতো, শিক্ষার জন্য প্রয়োজনে চীন যেতে হলে তাও যেতে হবে-তবুও শিক্ষা মানুষের চাই-চাইই। প্রকৃত শিক্ষা অজের্নর মাধ্যমে মানুষের মন-মানসিকতার উৎকষর্ সাধন সম্ভব। মানুষ নিজেকে সমাজে বিকশিত, উদারমনা,আলোকিত করে। একই সঙ্গে তার আলোয় পরিবার, সমাজ, দেশও আলোকিত হয়, আলোকিত হওয়ার সুযোগ পায়। একটি কুপিবাতি যেমন তার পাশ্ববতীর্ স্থানকে আলোকিত করে,তেমনি সে নিজেকেই আলোকিত করে। শিক্ষাটা এরকই একজন মানুষকে আলোকিত করে।
দেশের আথর্-সামাজিক উন্নয়ন ও সম্পদের সুষম ব্যবহারের জন্য শিক্ষা অপরিহার্য্য। কিন্তু বিদ্যান শিক্ষা ব্যাবস্থা সেই বিবেচনায় কতটুকু ভ‚মিকা রাখছে বা রাখতে পারছে তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। বিশেষ করে সৃজনশীলের নামে কোমলমতি শিক্ষাথীের্দর অযথা বই’, গাইড বই, নোট বই, তথাকথিত সাজেশন বইর ভারে ভারাক্রান্ত করে তোলা হচ্ছে। পাশাপাশি কোচিং, প্রাইভেট পড়ার জন্য প্রলুদ্ধ আবার কখনো কখনো বাধ্য করা হচ্ছে। এতে জাতির ভবিষ্যৎ কণর্ধারদের মেরুদণ্ডকে সোজা রাখার পরিবতের্ বঁাকিয়ে দিচ্ছে। এরকম অবস্থা চলতে থাকলে হয়তো এই তরুণ প্রজন্মের মেরুদণ্ড হয়তো ভেঙে যাবে না, কিন্তু মচকাবে। এতে বাস্তবিক অথের্ জাতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জাতিকে এই বিপদের হাত থেকে, বিশেষ করে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি নিভর্র শিক্ষার সুযোগ দিয়ে তাদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হলে সম্ভাবনাময় এসব তরুণ প্রজন্মই একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ উপহার দিতে পারবে। আর সে জন্য বিরাজমান সৃজনশীল শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনের হাতে কলমে শিক্ষাদান, পাশাপাশি মানবিক গুণাবলি অজির্ত হয় এমন শিক্ষাদানের প্রতি মনোনিবেশ করা দরকার।
এটা বলা সংগত হবে যে, এখনো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ঔপনিবেশিক ধাচের। কিছু কিছু ক্ষেত্রে উচ্চ শিক্ষায় যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কারিকুলাম সংশোধন করা হলেও তা যথেষ্ট নয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে তারা তাদের স্বাথির্সদ্ধির অনুকূল করে শিক্ষাব্যবস্থার বিন্যাস করেছিল। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের এত বছরেও শিক্ষাব্যবস্থা পূণবির্ন্যাসের লক্ষ্যে বিভিন্ন শিক্ষা কমিশন গঠন হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। তাই বাংলাদেশের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা হতাশার আর সৃজনশীলের নামে কোমলমতি শিক্ষাথীের্দর ‘গিনিপিগ’ খেলায় হতাশ এসব শিক্ষাথীর্ এবং তাদের অভিভাবকবৃন্দ। এ নিয়ে প্রায়শই তাদের ক্ষোভ-অসন্তোষ, হতাশার খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়, আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত মানসিকতা সম্পন্ন জাতি গঠনে সক্ষম নয়। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী হয়তো শিক্ষার হার বাড়ছে, কিন্তু সেবাধমীর্, মানবিক এবং পরিবতির্ত পরিস্থিতিতে নিজেদের তাল মিলিয়ে চলার মতো উপযোগী হচ্ছে না তারা। এদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অথৈর্নতিক ও আন্তজাির্তক প্রভৃতি কারণে শিক্ষাব্যবস্থা প্রত্যাশিত মান অজর্ন করতে পারেনি।
আমাদের এই ভ‚খণ্ড অন্যান্য উন্নত দেশের আয়তনের তুলনায় খুবই ছোট একটি রাষ্ট্র। কিন্তু জনসংখ্যায় অনেক বেশি। এই ছোট একটি দেশে যদি নানামুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু থাকে তাহলে এখানে অবশ্যই ভিন্ন ভিন্ন মন মানসিকতার মানুষ তৈরি হবে এটাই তো স্বাভাবিক। প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা- সরকারি, বেসরকারি, কিন্ডার গাটের্ন, মসজিদ ও মাদ্রাসাভিত্তিক শিশু শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এসব প্রতিটি বিভাগে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষা প্রদান কৌশল। যার ফলে ছোট থেকেই শিশুরা ভিন্ন ভিন্ন মন মানসিকতা নিয়ে গড়ে উঠছে। পরবতীের্ত আবার তারা যখন মাধ্যমিক পযাের্য় শিক্ষা নিতে আসছে সেখানেও রয়েছে ভিন্নতা-সরকারি, বেসরকারি, কওমি, ইবতেদায়ি, ইংলিশ মিডিয়াম ইত্যাদি।
এখানে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায় পাঠদানের ক্ষেত্রে রয়েছে ব্যাপক পাথর্ক্য। সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে ভতির্ পরীক্ষার মাধ্যমে বাচাই করা মেধাবী শিক্ষাথীের্দর নিয়ে পাঠদান করে থাকেন এবং যাদের অভিভাবকরাও যথেষ্ট সচেতন সেখানে কমর্রত শিক্ষকদের প্রচেষ্টা না থাকলেও শিক্ষাথীর্রা ভালো ফল করে থাকে। আবার গ্রামের শিক্ষা ব্যবস্থা, আর শহরের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও রয়েছে ব্যাপক ফারাক। বিশেষ করে গ্রামের স্কুলে শুধু বোডর্ বই পড়ানো হয়Ñ সেখানে নোট বই, গাইড-কোচিং এসব কিছুর বালাই নেই। অন্যদিকে শহরে বোডর্ বইর পাশাপশি নানা রকম গাইড, নোট বই, কোচির্ং প্রভৃতি শিক্ষাথীের্ক মৌলিক জ্ঞান চচার্র, মেধার বিকাশ, প্রকৃত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এসব কারণে দেখা যায়, পরবতীের্ত বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় শহরের শিক্ষাথীর্ অপেক্ষায় গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আসা শিক্ষাথীর্রা অধিক হারে সুযোগ পেয়ে থাকে। প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন, নানা অভিযোগ। এ ছাড়া মাদ্রাসা ও ইংলিশ মিডিয়াম বিদ্যালয় সমূহে সাংস্কৃতিক কমর্কান্ডসহ পারিপাশ্বিক পরিবেশ থাকে অনুপস্থিত। মূলত এভাবেই সমাজে, শিক্ষায় বৈষম্য ও বিভেদের দেয়াল তৈরি হয়। এরই মধ্যে আবার রয়েছে প্রতি বছর পাঠ্য বইয়ের পরিবতর্ন, সিলেবাসের পরিবতর্ন, মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবতর্ন যার ফলে একেক বছরের শিক্ষাথীর্র সঙ্গে অন্য বছরের শিক্ষাথীর্র মধ্যে পারষ্পরিক বৈপরীত্য, অসামঞ্জস্যতা সৃষ্টি হয়। এই বৈপরীত্য আর অসামঞ্জস্যতা নিয়েই প্রতি বছর উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে আসে হাজারও শিক্ষাথীর্। কিন্তু এই স্পষ্টকাতর অথচ জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আদশর্, মেধাবী, যোগ্য, মানবিক, সামাজিক গুণাবলি সম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থা কতটুকু সংগতিপূণর্, বস্তবসম্মত নয়। অবশ্য পরিবতির্ত যুগের সঙ্গে, প্রযুক্তির সঙ্গে, সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঢেলে সাজানো দরকার শিক্ষা ব্যবস্থা। সেখানে জ্ঞানাজের্ন, মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন মানুষ গড়ে যা প্রয়োজন সেটাই ব্যবস্থা করা দরকার। পাশাপাশি একজন শিক্ষিত মানুষ হবে অসাম্প্রদায়িক, উদার, মানবিক, মানব দরদী, সমাজ হিতোষি, সমাজ সচেতন, বিবেকবান সবোর্পরি নৈতিক বলে হবেন বলিয়ান। এ জন্য দরকার পঁুথিগত বিদ্যার পাশাপাশি নৈতিক, ধমীর্য়, সামাজিক শিক্ষা। বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থায় এসব অনুপস্থিত বলেই আজ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অবক্ষয়, অব্যবস্থা ঝেঁকে বসেছে। হিংসা-হানাহানি, রাহাজানি, নারীর প্রতি সংহিংসতা, বৈষম্য বেড়েছে সমাজে। এর করুণ দৃশ্যের প্রতিফলন ঘটে পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে। শিক্ষক, ডাক্তার, উকিল, সাংবাদিক, ড্রাইভার, ইঞ্জিনিয়ার, সরকারি চাকরিজীবীসহ প্রায় সব পেশায় নৈতিক অবক্ষয়ের ঘটনা ঘটছে অহরহ। এর বড় প্রমাণ, ভুল শিক্ষা, ভুল চিকিৎসা, ভুল অপারেশন, ভুল এক জায়গায় ক্ষত, অন্য জায়গায় চিকিৎসা, ভুল পরিকল্পনায় অবকাঠামো নিমার্ণ, স্থাপনা নিমার্ণ, পুল-কালভাটর্, ব্রিজ নিমাের্ণ অসংগতি দেখা দেয়। তার ওপর ভুল চিকিৎসা তো সরকারি হাসপাতালে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগীর ড্রেসিং এবং সাজির্ক্যাল কাজ করানো হয় ৩য় ও ৪থর্ শ্রেণির লোক দিয়ে- যাদের এ বিষয়ে কোনো একাডেমিক জ্ঞান নাই।
অজির্ত শিক্ষা দিয়ে শিক্ষাথীর্রা পরবতীর্ সময়ে কমর্জীবনে গিয়ে যদি সঠিকভাবে দেশ, সমাজ উন্নয়নে অবদান রাখতে ব্যথর্ হয় তা হলে সেই শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে হবে এখন থেকেই।
একই কথা প্রযোজ্য বিদ্যমান কারিগরি ও প্রকৌশল শিক্ষা নিয়েও। যাদের হাতেরে ছোয়ায় আমাদের দেশের উন্নয়ন, অবকাঠামো, বড় বড় স্থাপনা নিমার্ণ হয়। পরবতীের্ত দেখা যায়, নিমার্ণ কাজ শেষ হতে না হতেই বা নিমাের্ণর কিছুদিন যেতে না যেতেই ভেঙে বা ধসে পড়ে অনেক স্থাপনা। তাহলে এখানে কেন এমন হয়-এর দায় কার? আবার এখানে অসাধু ঠিকাদারদের সংশ্লিষ্টতা বা দায়ও থাকে। হয়তো প্রশ্ন ওঠতে পারে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে লিখতে গিয়ে পেশাজীবীদের কেন প্রসঙ্গ এল-উত্তর হচ্ছে, শিক্ষা ব্যবস্থার গোড়ায় গলদ বলেই এ অবস্থা। তাই দ্রæতই ভাবতে হবে প্রয়োগিক, কারিগরি ও বাস্তবসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে। তবেই দেশ জাতির মঙ্গল।
লেখিকা : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, কলাম লেখক

Developed by: