সর্বশেষ সংবাদ
এ্যাকশনে পুননির্বাচিত আরিফ  » «   ঈদের আগে খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করেছে বিএনপি  » «   সমকাল সম্পাদককে শেষ শ্রদ্ধা  » «   অনবদ্য তামিম ইকবাল  » «   ওরা এখনো নজরকাড়া  » «   শাবিপ্রবি’র হল বন্ধ  » «   সিলেটে ২১ আগষ্ট থেকে ৫ দিন বন্ধ বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার রিচার্জ  » «   ইকুয়েডরে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত  » «   ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন হ্যাক করা অত্যন্ত সহজ!  » «   সারা’র রুপে মুগ্ধ সবাই  » «   আবারও সিলেটে অনুষ্ঠিত হবে বঙ্গবন্ধু কাপ  » «   সিলেটে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি  » «   প্রতিদ্বন্দ্বি যখন যমজ বোন  » «   বিএনপি নির্বাচন বানচালের চক্রান্ত করছে : কাদের  » «   পঁচাত্তরে যেমন ছিল বাংলাদেশ  » «  

কোটা সঙ্কট : সমাধান কোন পথে?



Abusalekh-sekander
আবু সালেহ সেকেন্দার
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কোটা বিলুপ্তির মাধ্যমে সাধারণ ছাত্র-জনতার মধ্যে আওয়ামী লীগ এবং সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে নিয়েছিলেন । কোটা সংস্কারের আন্দোলনের কেন্দ্রিয় নেতাদের পুলিশি হয়রানির ঘটনা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সেই অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। কোটা সংস্কারের আন্দোলনের ছাত্র নেতৃবৃন্দকে জোর করে পুলিশ তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা অবশ্যই নিন্দনীয়। ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রিয় এক নেতার পিতাকে থানায় ডেকে নিয়ে হয়রানি করা কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না। কারোর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। কিন্তু এভাবে ভয় দেখিয়ে আন্দোলন দমন করা গ্রহণযোগ্য নয়।
সরকার বা পুলিশ যদি মনে করে কোটা সংস্কারের কেন্দ্রিয় নেতাদের বিরুদ্ধে হয়রানি মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে। তাদের পরিবারকে হয়রানি করলে এই আন্দোলন থেমে যাবে; তাহলে সরকার বা পুলিশের এই পর্যবেক্ষণ ভুল। কারণ এই আন্দোলন সাধারণ ছাত্ররা স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণ করেছেন। সরকার বা পুলিশ সম্ভবত সেই বার্তাটি এখনও বুঝতে ভুল করছে।
এখনও যদি সরকার মনে করে এটা বিরোধী দলের ষড়যন্ত্র অথবা বিএনপির একশত পচিশ কোটি টাকা বিনিয়োগের কারণে এই আন্দোলন হয়েছে, তাহলে চরম বোকামি হবে। একশত নয়, লক্ষ কোটি টাকা দিলেও সাধারণ ছাত্রদের অংশগ্রহণে এমন একটি স্বতস্ফূর্ত আন্দোলন সম্ভব নয়। বিরোধী দল গত এক দশকে বহু চেষ্টা করেও কোটা সংস্কারকারী ছাত্রদের মতো একটি আন্দোলন সংঘটিত করতে পারেনি। কারণ সাধারণ মানুষের এখন রাজনৈতিক আন্দোলন অংশগ্রহণে খুব বেশি আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। এমনকি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় জামায়াত-শিবির ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করেও সাধারণ মানুষকে তাদের আন্দোলনে যুক্ত করতে পারেনি। কিন্তু কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনটার প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, এই আন্দোলনে সাধারণ ছাত্ররা স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করেছেন। সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে দীর্ঘদিন যে ক্ষোভ দানা বেঁধেছিল এই আন্দোলন তার বহি:প্রকাশ।
দুই
বিএনপি-জামায়াতের সরকার বিরোধী আন্দোলনের সাথে যদি এই আন্দোলনকে গুলিয়ে ফেলা হয় তাহলে সরকার বা পুলিশ ভুল করবে। বিএনপি জামায়াতের আন্দোলন দমনের একই কৌশল এখানে প্রয়োগ করলে তা বাস্তবে কাজ করবে বলে মনে হয় না। দেশের প্রায় ৯৫ ভাগ ছাত্র এবং ৯০ ভাগ সাধারণ মানুষের এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন রয়েছে। এমন কি আওয়ামী এবং ছাত্রলীগের কর্মী-সমর্থকদেরও এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন রয়েছে। সরকার চাইলে তেলবাজদের বাদ দিয়ে নিরপেক্ষ কোন পক্ষ দিয়ে সত্যতা যাচাই করে দেখতে পারে।
নির্বাচনের কয়েকমাস পুর্বে যৌক্তিক আন্দোলনে দমন-নিপীড়নের কৌশল সরকারকে দূর্বল করবে। বিরোধী পক্ষকে শক্তিশালী করবে।
কোটা সংস্কারের দাবিতে কে নেতৃত্ব দিচ্ছে সেই বিষয়টি মূখ্য নয়। সরকার বা পুলিশির  দাবি আনুযায়ী এই আন্দোলনে শিবিরের সম্পৃক্ততা রয়েছে। সরকার বা পুলিশের দাবি অনেকাংশে সত্য বলে মনে হয়েছে। কারণ আন্দোলনকারীদের ক্ষুদ্র একটি অংশ সুকৌশলে মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক বিষয়গুলোকে বিকৃত করার চেষ্টা করেছে। গুজব ছড়িয়ে পরিবেশকে অস্থিতিশীল করতে চেয়েছে। কিন্তু এই ধারণা করা ভুল হবে যে, এই আন্দোলন শিবিরের এজেন্ডা বাস্তবায়নের আন্দোলন। তবে সত্যি শিবির যদি এই আন্দোলনে মূখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে, তবে তাদের অন্য উদ্দেশ্য আছে, যা অন্য সময় লেখার ইচ্ছে রইল। আগে কতটুকু তারা সম্পূক্ত সেটা জানা দরকার।
এই অন্দোলন মূলত সাধারণ ছাত্রদের আন্দোলন। সেখানে ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, বামপন্থী ছাত্রসংগঠনের মতো শিবিরের নেতা বা সমর্থকরা অংশগ্রহণ করেছে। বিষয়টা এই দৃষ্টিকোন থেকে দেখা দরকার। অযথা সাধারণ ছাত্রদের একটি আন্দোলনকে শিবির ট্যাগ দিয়ে শিবিরের জনসমর্থনকে বড় করে দেখানোর কোনো অর্থ নেই। শিবির যদি এত বড় একটি আন্দোলন সংঘটিত করার সামর্থ রাখে, তাহলে সরকার জামায়াত-শিবির মোকাবেলার যে কৌশল নিয়েছিল তা কি ব‌্যর্থ?
দুভার্গক্রমে সাধারণ ছাত্রদের একটি আন্দোলনকে জামায়াত-শিবির ট্যাগ দিয়ে সরকার বা পুলিশ এই বিষয়টি প্রমাণ করছে যে, শিবির বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। সাধারণ মানুষের মাঝে এই বার্তা যাচ্ছে যে, শিবির সাধারণ মানুষের যৌক্তিক দাবি নিয়ে আন্দোলন করছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দাবি মেনে নেয়ার পর এই ধরণে শিবির ট্যাগ যারা দিচ্ছেন, তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারকে কলঙ্কিত করছেন। প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়াই স্বাভাবিক, তাহলে মাননীয় প্রধাণমন্ত্রী কি স্বাধীনতা বিরোধী শিবিরের দাবির মূখে মাথানত করেছেন? সরকার বা পুলিশের উচিত হবে না সাধারণ মানুষের কাছে এই ভুল বার্তা দেয়া। অন্যদিকে কোটা সংস্কারের অন্দোলনের বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে স্থান পেয়েছে। সরকারের বা পুলিশের শিবির ট্যাগ দেয়ার ফলে বিদেশেও এই বার্তা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ বা সরকারের চেয়ে শিবির সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। কারণ সরকার তাদের আন্দোলনের মূখে দাবি মেনে নিয়েছে! শিবিরের কেউ যদি জড়িত থেকে থাকে এই আন্দোলণে অথবা নেতাদের কেউ যদি শিবিরের রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকে তাহলে সরকার সেই বিষয়টি অত্যন্ত কৌশলে মোকাবেলা করতে পারে। এভাবে ঢাকাঢোল পিটিয়ে সাধারণ ছাত্রদের আন্দোলণকে শিবিরের কৃতিত্ব বলে প্রচার করার কি অর্থ আছে বিষয়টি আমার বোধগম্য নয়!
এখানে কে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন সেই বিষয়টি মুখ্য বিষয় নয়। এই আন্দোলনে সাধারণ ছাত্রদের অংশগ্রহণ ছিল তা বোঝা দরকার। সেই অন্দোলনে ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, শিবির, বামপন্থী বা অন্য ছাত্রসংগঠণের সমর্থকদের সমর্থন বা অংশগ্রহণ থাকতে পারে। কিন্তু মূল আন্দোলনটা সাধারণ ছাত্রদের। সরকার বিষয়টা যদি এভাবে ভাবে তাহলে প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারবে বলে আশা করি। আর এই আন্দোলনে যড়যন্ত্র তত্ব খোজা হয় এবং বল প্রয়োগে দমন করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে শেষপর্যন্ত সরকার আন্দোলন দমনে কতটুকু সফল হবে তা নিয়ে আমার বিস্তর সন্দেহ আছে। শক্তিপ্রয়োগ করে বিরোধী দলকে দমন করা আর সাধারণ ছাত্রদের আন্দোলন দমন করা এক কথা নয়।
এই আন্দোলনের সাথে দেশের ৯৮ ভাগ ছাত্র সমাজের স্বার্থ জড়িত। তাই যদি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষনার বাস্তবায়ণ না হয়, তাহলেও আন্দোলন আবারও ছড়িয়ে পড়তে পারে। নেতাদের বিরুদ্ধে যদি শেষপর্যন্ত শিবির অভিযোগ প্রমানিতও হয়, তাহলে সেখানে নতুন নেতৃত্ব আসবে। কারণ এখানে বেকার তরুনদের স্বার্থের বিষয়টি জড়িত। লক্ষ কোটি তরুন সরকারি চাকরি করতে চায়। তারা মনে করে, বর্তমান কোটা প্রথা তাদের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মূল অন্তরায়। তাই তারা যে কোনোভাবেই এই দাবি বাস্তবায়ণ করতে চাইবে। এখানে কে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে সেই বিষয়টি মূখ্য নয়। সরকারকে এই সাধারণ বিষয়টি বুঝতে হবে। কোটা সংস্কারের নেতৃত্বদানকারী ছাত্রনেতাদের বিরুদ্ধে মামলা করে, হয়রানি করে অথবা মাইনাস করলেই এই আন্দোলন স্তব্ধ হয়ে যাবে এই ধারণা বাস্তব সম্মত বলে মনে হয় না। তাই সরকারের উচিত হবে দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করে এই ইস্যুর অবসান ঘটানো।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে উচ্চশিক্ষায় হাঙ্গেরিতে অধ্যায়নরত।

Developed by: