সর্বশেষ সংবাদ
রাজ-শুভশ্রী এক বাঁধনে  » «   বাংলাদেশ নতুন যুগে প্রবেশ করেছে : প্রধানমন্ত্রী  » «   আগাম বন্যার আশঙ্কা  » «   ঈদে আসছে ‘আমার প্রেম আমার প্রিয়া’  » «   বজ্রপাতে একদিনে সারাদেশে ৩০ জনের মৃত্যু  » «   জাতীয় অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামের ইন্তেকাল  » «   জাতিসংঘ মিশন : সিলেটের ২০০ স্বপ্নবাজ তরুণের নেতৃত্বে হাওরসন্তান সোহাগ  » «   বিয়ানীবাজারে বুদ্ধি প্রতিবন্ধি যুবতীকে ধর্ষণের অভিযোগে যুবক গ্রেফতার  » «   বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন সোনম কাপুর আর আনন্দ আহুজা  » «   এসএসসি ফল পুনঃনিরীক্ষন শুরু : একাদশে ভর্তি ১৩ মে থেকে  » «   ষাঁড়ের গুতোয় কৃষকের মৃত্যু  » «   পা-ই তার সাফল্যের চাবিকাটি  » «   গাছ ভেঙে পড়ায় সিলেটের সাথে রেল যোগাযোগ বন্ধ  » «   এসএসসিতে সিলেটে পাস ৭০.৪২% : জিপিএ-৫ ৩১৯১ জন  » «   নিয়োগ চলছে কামা পরিবহন (প্রা. লি.)-এ।  » «  

উদীচীর জাতীয় সম্মেলনে হামলা:১৯ বছরেও বিচার শেষ হলো না!



DO    প্রান্তডেস্ক:   ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক ভয়াবহ রক্তাক্ত দিন। এই দিনে যশোর টাউন হল মাঠে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে নৃশংস বোমা হামলা চালায় মৌলবাদী গোষ্ঠী। উদীচীর ১০ জন সাংস্কৃতিক কর্মী এতে প্রাণ হারান, আহত হন দুই শতাধিক। নিহত ১০ জন হলেন নূর ইসলাম, নাজমুল হুদা তপন, সন্ধ্যা রানী ঘোষ, ইলিয়াস মুন্সী, শাহ আলম বাবুল, বুলু, রতন রায়, বাবুল সূত্রধর, শাহ আলম ও রামকৃষ্ণ। ১৯টি বছর ধরে সহকর্মী হারানোর বেদনা বুকে চেপে  সাংস্কৃতিক আদর্শিক  বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে সহ উদীচী্ শিল্পীগোষ্ঠীসহ প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মি রা ।অব্যাহত রেখেছেন মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম । যাঁরা আহত হয়েছিলেন, ১৯টি বছর ধরে সেই ভয়াবহ স্মৃতি বহন করে এখনো তাঁরা সাংস্কৃতিক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন গনমানুষের বাংলাদেশ বিনির্মাণে।
উদীচীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনে মৌলবাদীদের বোমা হামলার মধ্য দিয়েই সমগ্র বাংলাদেশ প্রথম প্রত্যক্ষ করে কী ভয়াবহ নৃশংসতায় একাত্তরের পরাজিত শক্তি গ্রাস করতে যাচ্ছে বাংলাদেশকে। যশোরে উদীচীর সম্মেলনে বোমা হামলা চালানোর পরই জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও মুক্তচিন্তা ওপর একের পর এক বোমা হামলা চালাতে থাকে। উদীচীর যশোর ট্র্যাজেডির মাত্র সাত মাস পর (৮ অক্টোবর, ১৯৯৯) খুলনা শহরে আহমদিয়া মসজিদে বোমা হামলা চালিয়ে আটজনকে হত্যা করা হয়। এরপর গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ৭৬ কেজি ওজনের শক্তিশালী বোমা পুঁতে রাখা হয় (২০ জুলাই, ২০০০)। জনসভা শুরুর আগেই সেটি উদ্ধার হওয়ায় প্রাণে বেঁচে যান অনেক মানুষ। সিপিবির জনসভায় বোমা হামলা (২০ জানুয়ারি, ২০০১), রমনা বটমূলে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা (১৪ এপ্রিল, ২০০১), গোপালগঞ্জের বানিয়াচংয়ে গির্জায় প্রার্থনার সময় বোমা হামলা (৩ জুন, ২০০১) এভাবে একের পর এক জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটতেই থাকে। কিন্তু কোনো ঘটনারই বিচার হয়নি। বিচার করতে না-পারা রাষ্ট্রের একটি দুর্বলতা। সেই দুর্বলতার সুযোগেই জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো তাদের বিস্তার ঘটিয়েছে। বিচারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের উদাসীনতাই আজকের বাংলাদেশকে ঠেলে দিয়েছে অধ্যাপক জফর ইকবালের উপর জঙ্গি হামলার ভয়ানক পরিণতির দিকে।
যশোরে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ওপর বোমা হামলার ১৯ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও কোনো বিচার শেষহয়নি আমাদের আহত সাংস্কৃতিক কর্মীরাএই বিচারটি দেখার প্রত্যাশায় আজও বোমা হামলার ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু ১৯ বছর রাষ্ট্রে এই বিচার নিয়ে নানা রকমের নাটক চলছে। বিচারহীনতার কারণে একদিকে যেমন চাপা ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে দেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যে, অন্যদিকে মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো সাপের পাঁচ পা দেখে তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত করছে। এমন ন্যক্কারজনক একটি ঘটনার বিচারিক কার্যক্রম যদি১৯বছরেও শেষ না হয়, তাহলে জনসাধারণের আস্থার আশ্রয় কোথায়? এখনো মূল ঘাতকদের বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি।
উদীচী হত্যাকাণ্ড মামলায় ১৯৯৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর বিএনপির তৎকালীন স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলামসহ ২৪ জনের নামে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ওই সময় তরিকুল ইসলামের আবেদনে হাইকোর্ট তাঁর নাম বাদ দেন। পরে ২০০৬ সালের ৩০ মে যশোরের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলার ২৩ আসামিকে বেকসুর খালাস দেন। বিশেষ ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর ন্যায়বিচার পেতে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পুনঃ তদন্তের আবেদন করলে মামলাটির বর্ধিত তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় সিআইডিকে। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গ্রেপ্তার হরকাতুল জিহাদ (হুজি) নেতা মুফতি হান্নানকে। ওই বছরের ১৯ নভেম্বর হান্নান আদালতে উদীচী বোমা হামলায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। তাঁর স্বীকারোক্তিতে পুলিশ হরকাতুল জিহাদের সদস্য বরিশালের আবুল হোসেন ও মাদারীপুরের মাওলানা আবদুর রউফকে আটক করে।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের দায়িত্ব পেলে নিম্ন আদালতের রায়ের (২০০৬ সালের রায়) বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করা হয়। ২০১১ সালের ৪ মে সরকারের দায়ের করা আপিলটি গ্রহণ করেন বিচারপতি সিদ্দিকুর রহমান মিয়া ও কৃষ্ণা দেবনাথের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ। এর পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত মামলায় খালাসপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পুনরায় আত্মসমর্পণের জন্য সমন জারির নির্দেশ দেন। এ–সংক্রান্ত একটি আদেশ ২০১১ সালের ২০ জুন যশোর বিচারিক হাকিম আদালতে পৌঁছায়। এরপর ২১ জুন খালাসপ্রাপ্ত ২৩ আসামির বিরুদ্ধে সমন জারি করেন মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালত। এর মধ্যে তিন আসামি মহিউদ্দিন আলমগীর, আহসান কবীর হাসান ও মিজানুর রহমান মিজানের মৃত্যু হওয়ায় বাকি ছিলেন ২০ জন। তাঁদের মধ্যে ১৭ জন বিভিন্ন সময়ে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন। পরে তাঁদের মধ্যে সাইফুল ইসলাম নামে এক আসামি ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে খুন হন। আসামিদের মধ্যে শফিকুল ইসলাম মিন্টা, শরিফুল ইসলাম লিটু ও সোহরাব নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণ না করলে তাঁদের বিরুদ্ধে ২০১১ সালের
২৪ জুলাই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। শফিকুল ইসলাম মিন্টা ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে আটক হন। পরে তিনিও জামিন লাভ করেন। ১৯ বছর পর বিচারিক অগ্রগতি হলেও এই মামলার সব আসামি এখন জামিনে আছেন! সত্যিই সেলুকাস! কী বিচিত্র বিচারিক কার্যক্রম!
কেবল যশোরেই নয়, ২০০৫ সালের ৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর নেত্রকোনা জেলা সংসদ কার্যালয়ের সামনেও আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানো হয়। সেখানেও নিহত হন সাতজন। আজ পর্যন্ত কোনো বিচার পায়নি দেশবাসি। কিন্তু লড়াইটি থেমে থাকেনি, থাকবেও না।  এখনো বৈষম্য, মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্ রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক লড়াই চলছে। আমরা বিশ্বাস করি, জনতার ঐক্যই দানবের দম্ভ ভাঙবে।

Developed by: