সর্বশেষ সংবাদ
ইকুয়েডরে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত  » «   ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন হ্যাক করা অত্যন্ত সহজ!  » «   সারা’র রুপে মুগ্ধ সবাই  » «   আবারও সিলেটে অনুষ্ঠিত হবে বঙ্গবন্ধু কাপ  » «   সিলেটে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি  » «   প্রতিদ্বন্দ্বি যখন যমজ বোন  » «   বিএনপি নির্বাচন বানচালের চক্রান্ত করছে : কাদের  » «   পঁচাত্তরে যেমন ছিল বাংলাদেশ  » «   চঞ্চল চৌধুরীর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন জয়া!  » «   ওসমানী বিমানবন্দরে নারীর জুতা ও পেটের ভেতর থেকে স্বর্ণের বার উদ্ধার  » «   প্রামাণ্যচিত্র ‘বঙ্গবন্ধু বাংলার ধ্রুবতারা’  » «   ভারতের সাবেক স্পিকার সোমনাথ আর নেই  » «   শহিদুলের চিকিৎসার আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন খারিজ  » «   অদ্ভূত মিল!  » «   ‌’ঈদের পর পেঁয়াজের দাম কমবে’  » «  

‘নিখোঁজ’ সংস্কৃতি ও সংবাদমাধ্যমের সংবেদনশীলতা



sylhetআবু সাঈদ খান;নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। অতীতেও হতো। তখন নিখোঁজ মানে সাধারণত ঘর পালানো বা নিরুদ্দেশ হওয়া বোঝানো হতো। নিখোঁজ আর নিরুদ্দেশ ছিল প্রায় সমার্থক। সে সময়ের নিখোঁজরা ঠাঁই পেয়েছে গল্প, উপন্যাস ও চলচ্চিত্রে।
আজকের মতো ‘ঘরকুনে’ বাঙালির দূর দেশে যাওয়ার চল ছিল না।
তাই সুদূরের পিয়াসী যাদেরকে পাহাড়, সমুদ্র বা ভিন-সভ্যতা হাতছানি দিত কিংবা সৈনিক বা নাবিকের পেশা তাড়া করত, তাদের ঘর পালানো ছাড়া পথ ছিল না। কেউ কেউ আবার জীবনযুদ্ধের জন্য দেশান্তরী হতো। এরাও ছিল নিখোঁজের গোত্রভুক্ত। এমন নিখোঁজ থাকতে হয়েছিল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকেও। জাত-পাত-বিভক্ত সমাজে যাদের প্রেম বাধা মানত না, তারাও পালাত। কোনো এক গ্রামের তরুণকে যখন খুঁজে পাওয়া যেত না, তখন চাউর হতো- ভিন্ন গোত্রের আরেক তরুণী গাঁ ছেড়েছে। বলা যায়, অতীতের নিখোঁজদের অনেকেই প্রথাবিরোধী অসম প্রেমের পথিকৃত।
তন্ত্র-মন্ত্র-যোগ সাধনা তরুণদের আকৃষ্ট করত। সন্ন্যাসী-ফকির হয়ে দেশে দেশে ঘুরত। তারাও স্বজনদের কাছ ছিল নিখোঁজ। এই নিখোঁজরাই আমাদের ইতিহাসের গৌরবদীপ্ত ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের বীরনায়ক। তবে তখন নিখোঁজদের তালিকায় গুম ছিল না- এমন দাবি করার সুযোগ নেই। জমিদার বা প্রভাবশালীদের হাতে গুম হওয়ার ঘটনাও ঘটত। তবে তা ছিল কদাচিৎ।
নিখোঁজের সঙ্গে গুমের এমন নিবিড় মেলবন্ধন নতুন। এখন কেউ নিখোঁজ হলে স্বজনদের মধ্যে প্রথমে গুমের আশঙ্কাই উঁকি দেয়, তারপর অন্যকিছু। রাজনীতিক কর্মী, সাংবাদিক, লেখক, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, আমজনতা আজ গুমের শিকার। সমগ্র জাতিই যেন গুম আতঙ্কগ্রস্ত।
গুম কী:
এটি বোধহয় ব্যাখ্যা করার দরকার নেই। বাংলাদেশের মানুষের জানা- গুম মানে হারিয়ে যাওয়া, লাশ হয়ে ফেরা বা না ফেরা। গুম বা এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স সম্পর্কে জাতিসংঘের সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত। তা হলো- Enforced disappearance is considered to be the arrest, detention, abduction or aû form of deprivation of the liberty by agents of the state or by persons or groups of persons acting with the authori“ation, support or aquiescence of the state, followed by the refusal to acknowledge the deprivation of liberty or by concealment of the fate or whereabouts of the disappeared persons, which place such a person outside the protection of the lwa (Article 2).

গুম হলো মানবাধিকারের বহুমাত্রিক লঙ্ঘন। বিশেষজ্ঞরা সর্বজনীন মানবাধিকারের লঙ্ঘনের যেসব ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছেন, সেগুলো হচ্ছে-
· The right to recognition as a person before the law;
· The right to liberty and security of the person;
· The right not to be subjected to torture and other cruel, inhuman or degrading treatment or punishment;
· The right to life, when the disappeared person is killed; The right to an identity;
· The right to a fair trial and to judicial guarantees;
· The right to an effective remedy, including reparation and compensation;
· The right to knwo the truth regarding the circumstances of a disappearance.
এটি ভিকটিম ও তাদের পরিবারের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সামাজিক অধিকারেরও লঙ্ঘন। যেমন-
· The right to protection and assistance to the family;
· The right to an adequate standard of living;
· The right to health;
· The right to education.
মানুষের এই মৌলিক ও মানবিক অধিকার সংরক্ষণে ১৯৯২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ‘The International Convention on the Protection of all Persons from Enforced Disappearances’ পাস করা হয়। ৪২টি অনুচ্ছেদের এই কনভেনশনের মর্মবাণী ১ম অনুচ্ছেদেই প্রতিফলিত- No one shall be subjected to enforced disappearances. তাই জাতিসংঘের উদ্যোগে মানবাধিকার সমুন্নত রাখতে Committee of Enforced Disappearances (CED) কর্মরত।
বিভিন্ন দেশে গুম:
গুম বৈশ্বিক ঘটনা। এটি ঘটেছে নানা দেশে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালে গুমের প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল হিটলারের জার্মানিতে। তখন পুলিশের গোপন বাহিনী-গেস্টেপো বাহিনী জার্মানি ও তাদের অধিকৃত দেশগুলোয় অগণিত ভিন্ন মতাবলম্বী বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে তুলে নিয়ে বা বন্দি অবস্থায় হত্যা করেছে। গুয়েতেমালায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তাঁবেদার সরকারের সেনা ও নিরাপত্তা কর্মীদের হাতে ৩৬ বছরে (১৯৫৪-৯০) ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষ গুম হয়। তুরস্কে কুর্দিদের গুমের শিকার হওয়ার ঘটনা (১৯৮০-৯০) বহুল আলোচিত। গুমের অভিযোগ আছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ইরানসহ নানা দেশের বিরুদ্ধে। গুমের প্রাদুর্ভাব থেকে মুক্ত নয় উপমহাদেশও। গত শতকের ষাট ও সত্তর দশকে ভারতে নকশালবাড়ী আন্দোলন দমন অভিযানে অনেক আন্দোলনকারী গুম হয়েছে। জরুরি আইনের (১৯৭৫-৭৭) ছত্রছায়ায় পাঞ্জাবে ব্যাপক গুমের ঘটনা ঘটেছে। গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়ে চলেছে কাশ্মিরে। ২০১১ সালে কাশ্মিরে ২ হাজার ১৫৬ জন অজ্ঞাত ব্যক্তির কবর চিহ্নিত করেছে- যারা গুপ্ত হত্যার শিকার বলে জম্বু কাশ্মির হিউম্যান রাইটস কমিশনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাকিস্তানে মানবাধিকার পরিস্তিতি বরাবরই উদ্বেগজনক। কেবল জেনারেল পারভেজ মোশারফের শাসনকালে প্রায় ৫ হাজার লোক গুম হয়। গুম এখন বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয়।
বাংলাদেশে গুম:
বাংলাদেশের দিকে যদি তাকাই, সব সরকারের শাসনকালে গুম ও আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। কোন আমলে কত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়েছে তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আছে। কিন্তু রহস্য উদঘাটনের তেমন উদ্যোগ কখনোই ছিল না, এখনও নেই। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও বহুলাংশে নির্বিকার। তাই এ নিবন্ধে অতীতের অনালোকিত অধ্যায়ে যাওয়ার তেমন সুযোগ নেই। এ লেখায় প্রধানত সাম্প্রতিক সময়ের নিখোঁজ সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করব।
গুমের ভয়ার্ত রূপ প্রকাশ পেয়েছে সমকালের একটি প্রতিবেদনে। ‘চোখের কোনায় টলমল করছিল অশ্রু। তসবিহ হাতে দাঁড়িয়েছিলেন বাসার গেটে। অপেক্ষা করছিলেন বাবা ও স্বামীর ঘরে ফেরার আশায়। দীর্ঘদিন ধরে (২০১১) স্বপ্নার বাবা আওয়ামী লীগ নেতা নুর মোহাম্মদ ওরফে নুরু হাজী রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ। খোঁজ নেই স্বপ্নার স্বামী আবদুল মান্নানেরও। পশ্চিম আগারগাঁওয়ের শাপলা হাউজিংয়ের ২১৩/১৬ নম্বর বাসায় এখন নীরব হাহাকার। কী ঘটেছে নুরু হাজী ও মান্নানের ভাগ্যে- এ নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই। একের পর এক রহস্যজনক নিখোঁজের পর রাজধানীসহ সারাদেশে অনেক স্বপ্নার চোখে দুঃস্বপ্নের চিহ্ন। আলোচিত নিখোঁজ ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার ও বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম। ২০১০ সালের ২৫শে জুন রাজধানীর ইন্দিরা রোডের এক আত্মীয়ের বাসা থেকে প্রাইভেটকারে ধানমণ্ডি যাওয়ার পথে সাদা পোশাকধারী ব্যক্তিরা তাকে তুলে নিয়ে যায়। তখন থেকেই তিনি নিখোঁজ। এমন নিখোঁজের ঘটনা অনেক। গত ২৯শে জুন (২০১১) কারওয়ানবাজার থেকে নিখোঁজ হন ছাত্রলীগ নেতা মিজানুর রহমান। গত ২রা জুলাই তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ড থেকে লাশ উদ্ধার করা হয়। লাশ হাতকড়া পরা অবস্থায় ছিল। গত ২৬শে অক্টোবর ঢাকার ফকিরাপুল থেকে তুলে নেওয়া হয় ফেনীর সোনাগাজীর বাসিন্দা সারোয়ার জাহান বাবুলকে। তিনি ঘটনার দিন হাইকোর্ট থেকে একটা মামলার জামিন নিতে ঢাকায় এলে রাত ৮টার দিকে ‘পুলিশ’ পরিচয়ে কয়েক যুবক তাকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়।
২০১৫ সালের ১০ই মার্চ অপহৃত হন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাউদ্দিন আহমেদ। অপহরণের দুই মাস পর তাকে পাওয়া যায় ভারতের শিলংয়ে। সন্ধান মিলছে না বিএনপির অপর নেতা ইলিয়াস আলীর।
২০১৭ সালের শেষের দিকে আলোচিত ‘নিখোঁজ’ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোবাশ্বার হাসান সিজার, পুস্তক ব্যবসায়ী তানভীর ইয়াসিন করিম, সাংবাদিক উৎপল দাস, কল্যাণ পার্টির মহাসচিব আমিনুর রহমান, ব্যাংক কর্মকর্তা শামীম আহমেদ ও সাবেক কূটনীতিক মারুফ জামান। এসব অপহরণ নিয়ে নাগরিক সমাজ সোচ্চার হয়। প্রতিবাদের ঝড় ওঠে সোশ্যাল মিডিয়ায়। স্বস্তিদায়ক ব্যাপার- একে একে ফিরে এসেছেন তানভীর, আমিনুর, উৎপল, অনিরুদ্ধ ও সিজার। কূটনীতিক মারুফ জামান এখনও না-ফেরার দলে।
নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ‘We Don`t Have Him, Secret Detentions and Enforced disappearance in Bangladesh- নামক প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু ২০১৬ সালেই কমপক্ষে ৯০ জন ব্যক্তি জোরপূর্বক নিখোঁজের শিকার হয়েছেন। যদিও গোপনে আটকে রাখার কিছু সপ্তাহ পর অথবা মাসের মধ্যে তাদের আদালতে হাজির করা হয়। কিন্তু হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২১টি ঘটনা লিপিবদ্ধ করে। সেখানে আটককৃতদের পরে হত্যা করা হয় এবং অন্য ৯ জনের অবস্থান এখনও অজানা। আটককৃত ৯০ জনের মধ্যে বিরোধী দলের বিশিষ্ট নেতাদের তিনজন পুত্র রয়েছেন, যাদের ২০১৬ সালে আগস্ট মাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। একজনকে গোপনে ৬ মাস আটক রাখার পর ছেড়ে দেওয়া হয় এবং অন্য দু’জন এখনও নিখোঁজ। ২০১৭ সালের প্রথম পাঁচ মাসে ৪৮টি নিখোঁজ তালিকাভুক্ত হয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার হেফাজতে থাকাকালীন তাদের ওপর নির্যাতন ও বাজে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।’ ওই রিপোর্টে আরও বলা হয়, ‘সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করার প্রয়োজন মনে করছে না, তার পরিবর্তে নীরব থাকছে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে একই ভূমিকা প্রত্যাশা করছে। এই নীরবতা ভঙ্গ করা প্রয়োজন।’ ‘হংকং ভিত্তিক এসিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন (এএইচআরসি) ও দেশীয় মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের হিসাব অনুযায়ী, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের (২০১৭) সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৮ বছর ৯ মাসে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৩৯৫ জন নিখোঁজ হয়েছেন। পরবর্তী সময় তাদের মধ্য থেকে ৫২ জনের লাশ পাওয়া গেছে। ফিরে এসেছেন ১৯৫ জন। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ১৪৮ জন।’ ‘এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৩৯৫ জন গুমের ঘটনার মধ্যে ১৪৮টিতে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে র‌্যাবের বিরুদ্ধে। পুলিশের ৪৬ জনকে, র‌্যাব ও ডিবি যৌথভাবে ১১ জনকে, ডিবি ১০৬ জনকে, শিল্প পুলিশ ও আনসার ১ জন করে এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ৮২ জনকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।’

‘মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য মতে, চলতি বছরের (২০১৭) সাত মাসে (৩১ জুলাই পর্যন্ত) নিখোঁজ হয়েছে ৪৫ জন। যাদের মধ্যে দু’জনের লাশ পাওয়া যায়। গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে তিনজনকে। ফেরত এসেছে সাতজন। বাকি ৩৩ জন এখনও নিখোঁজ। গত বছর, ২০১৬ সালে ৯৭ জন নিখোঁজ হওয়ার পর গুমের অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে ১১ জনের লাশ পাওয়া গেছে। ২৬ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আর তিনজন ফিরে এলেও নিখোঁজ রহস্য উšে§াচিত হয়নি। বাকি ৫৭ জনের খোঁজ নেই এখনও। এই সংস্থাটির তথ্য মতে, ২০১৫ সালে নিখোঁজ হয়েছে ৫৫ জন, যাদের আটজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। সাতজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে এবং ফেরত এসেছে পাঁচজন। এখনও নিখোঁজ ৩৫ জন। ২০১৪ সালে নিখোঁজ হয় ১০২ জন, যাদের ৮৮ জন আজও বাড়ি ফেরেনি। ২০১৩ সালে ৫৮ জনের মধ্যে ৫৩ জন নিখোঁজ ছিল। ২০১২ সালে ৫৬ জনের মধ্যে ৩৪ জন; ২০১১ সালে ৫৯ জনের ৩৯ জন এবং ২০১০ সালে ৪৬ জন অপহৃতের মধ্যে ৩৩ জনকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এর আগে ২০০৭ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত ২১ জন নিখোঁজ হয়, যাদের ১৮ জনের খোঁজ মেলেনি। এই হিসাবে ১০ বছর সাত মাসে ৫৩৯ জন নিখোঁজ ব্যক্তির মধ্যে ৩৯০ জন আজও ফেরেনি।… ২০০৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৫৪০ জনকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৭৮ জনের লাশ পাওয়া গেছে। ৩৪৭ জন নিখোঁজ।’
নিখোঁজদের নিয়ে সংবাদমাধ্যমে যেসব প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে তা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়; পরিবারগুলোর দাবি- ভিক্টিমকে র‌্যাব, ডিবি বা পুলিশ পরিচয়ে বাড়ি, কর্মস্থল বা রাস্তা থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে। তবে কোনো কোনো অপহরণের ঘটনা অজ্ঞাত রয়েছে। স্বজনরা থানায় জিডিও করেছে। সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগ সংস্থা যথারীতি অস্বীকার করে। তারপর আমরা দেখি- কারও কারও লাশ পাওয়া যায় রাস্তার ধারে, নর্দমায়, জঙ্গলে বা নদীর জলে। কেউ কেউ দু-চার মাস পর আদালতে নীত হন; তবে নথিপত্রে থাকে অন্য স্থান থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের তারিখ-ক্ষণ। আর একদল কিছুদিন পরে ফিরে আসেন। তাদের বেশিরভাগের মুখে কলুপ। তবে কেউ কেউ আবার মুখ খোলন, গল্প বলেন। ফিরে আসা একজনের গল্প আরেকজনের সঙ্গে মিলে যায়। মনে হয়, একই কথাশিল্পীর রচনা। ভিকটিমের মধ্যে অনেকে এখন জেলে আছেন, কেউ কেউ ফিরে এসেছেন, কেউ বা ফিরেছেন লাশ হয়ে। আর যারা জেলে নেই, জীবত বা মৃত অবস্থায় ফেরেননি। কেউ জানে না- তারা এখন কোথায়, জীবিত না মৃত।
র‌্যাবসহ সব সংস্থাই এটি অস্বীকার করে আসছে। এ প্রসঙ্গে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘র‌্যাবের বিরুদ্ধে তো কোনো অভিযোগ নেই। বলা হচ্ছে, র‌্যাব পরিচয়ে তুলে নেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন আমরা ভুয়া ডিবি, ভুয়া র‌্যাব পাচ্ছি। আর আমাদের কোনো গাড়ি কোথায় টহল দিচ্ছে সেটা সদর দপ্তর থেকে নজরদারি করা হয়। কাজেই র‌্যাবের এসবে জড়ানোর সুযোগ নেই।’ পুলিশ ও র‌্যাব কর্মকর্তা বিভিন্ন সময়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন এবং দিচ্ছেন তা একই রকম। এ ক্ষেত্রে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমানের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য- ‘এভাবে একের পর এক মানুষ গুম হয়ে যাওয়ার ঘটনা সমাজে ভীতকর পরিবেশ তৈরি করছে। আর গুম হওয়া ব্যক্তিদের একের পর এক লাশ উদ্ধার হওয়ায় এ ভীতির পরিমাণ বাড়ছে। যদি এসব ঘটনার সঙ্গে আইন রক্ষাকারী বাহিনী জড়িত না থাকে, তবে এগুলোর পেছনের ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে তা প্রমাণ করতে হবে।’ সর্বশেষ খবর, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে- গুম এখনও চলছে। ‘অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গুমের ঘটনা ঘটছে নিয়মিতভাবে। এর প্রধান শিকার হচ্ছেন বিরোধীদলীয় সমর্থকরা। গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের কারও কারও লাশ মিলেছে। চলতি ফেব্রুয়ারিতে গুমবিষয়ক জাতিসংঘের একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের কাছে একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গুমের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, গত বছর ৮০ জনের বেশি মানুষ গুমের শিকার হয়েছে। গত অক্টোবরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক
মুবাশ্বার হাসানের কথিত অপহরণ ও ৪৪ দিন পর তার বাড়িতে ফিরে আসার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন ও অন্যান্য ধরনের অসদাচরণের ঘটনা এখনও ব্যাপক। কিন্তু এসব ঘটনায় তদন্ত বিরল। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সচেতনতার অভাবে ‘দ্য ২০১৩ টর্চার অ্যান্ড অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল রিপোর্ট ২০১৭-১৮ ৮৯ কাস্টডিয়াল ডেথ (প্রিভেনশন) অ্যাক্ট’-এর যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে নিয়মিত গুমের যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তা সত্য নয় বলে মনে করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন। তিনি বলেন, প্রতিবেদনে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তাদের কাউকেই সরকার আটক করেনি। তাই কাউকে ছেড়ে দেওয়া বা আটক রাখার প্রশ্নই ওঠে না।’
ঘটনার পরম্পরা :
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হওয়ার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব। তিন জোটের যুক্ত ঘোষণার ৪ ধারায় বলা হয়… ‘(খ) জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা হবে। (গ) মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি সব আইন বাতিল করা হবে।’ ঘোষিত নীতির পথে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী বড় দুই দল অগ্রসর হলো না। বরং উল্টা পথেই হাঁটল।
গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় স্বৈরশাসক এরশাদের রেখে যাওয়া বুট, ডান্ডা, কালাকানুন পরিহার করা হলো না। এমন কি এরশাদের পদলেহী রাজনীতিক ও ‘ক্যাডার’দের নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু হলো। দেখতে দেখতেই গণতন্ত্রের মোড়কে কর্তৃত্ববাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। এর উলঙ্গ প্রকাশ ঘটল খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াত সরকারের শাসনকালে। ‘২০০২-এর ১৬ই অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ই জানুয়ারি পর্যন্ত ‘অপারেশন ক্লিনহাটর্’ নামে যৌথ বাহিনীর অভিযান চলে। প্রায় চার মাসের অভিযানে অর্ধশতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়।’ তখন সরকার ও যৌথবাহিনীর পক্ষ থেকে এরা ‘হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে’ মারা গেছেন বলে দাবি করা হয়। ওই অভিযানের কার্যক্রমকে দায়মুক্তি দিয়ে ২০০৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ‘যৌথ অভিযান দায়মুক্তি আইন, ২০০৩’ করা হয়। (যদিও ২০১২ সালে এ আইনকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট)। বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলেই ‘২০০৪ সালের ২১শে মার্চ পুলিশের অভিজাত বাহিনী হিসেবে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। আর র‌্যাবের ক্রসফায়ারে মৃত্যুর ঘটনা শুরু হয় ২৬ জুন থেকে। ওই সময়ে র‌্যাবের দেখাদেখি পুলিশও ‘ক্রসফায়ারে’ নেমে পড়ে। জানা যায়, ২০০৪ সালে ক্রসফায়ারে মারা যায় ৫৫ জন, ২০০৫ সালে ৩৯৫ জন, ২০০৬ সালে ৩৬১ জন, ২০০৭ সালে ৩৫১ জন এবং ২০০৮ সালে মারা যায় ১৮৬ জন। এ সময়ে র‌্যাবের হাতে প্রাণ হারায় ৫৮৬ জন। অন্যরা মারা যায় পুলিশের হাতে।’ এ সঙ্গে সর্বশেষ সংযোজন ‘গুম’ কার্যক্রম। ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক সমালোচিত হওয়ার পর ‘গুম’ পদ্ধতি চালু হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। দুটিই মানবাধিকারের লঙ্ঘন। আন্তর্জাতিক আইনেও অপরাধ। ক্রসফায়ার আর গুমের মধ্যে পার্থক্য- ক্রসফায়ারে আলামত থাকে, গুমের কোনো চিহ্নই থাকে না। এই দুই থাবায় জননিরাপত্তা ও মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত।
পর্যালোচনা :
এসব অভিযান যে বিরোধী পক্ষ বা ভিন্ন মতাবলম্বীদের দমনের লক্ষ্যেই হয়েছে তা বলা যাবে না। দেখে গেছে- শুরুতে ক্লিনহার্ট অপারেশন, বন্দুকযুদ্ধ বা গুমের শিকার সন্ত্রাসীরাই। বলা যায়, রাজনৈতিক পরিচয়ধারী সন্ত্রাসীদের ক্ষেত্রে সরকার বা বিরোধী দল বিবেচনায় আনা হয়নি। ফলে এসব কার্যক্রম জনপ্রিয়তাও লাভ করেছে, চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের মৃত্যুতে সাধারণ মানুষ উল্লাসও করেছে।
এখন প্রশ্ন, জনতা উল্লসিত হলেই কি তা সমর্থনযোগ্য? জনসমর্থনের দোহাই দিয়ে কারও মানবাধিকার হরণ করা যায় না, বেআইনি কোনো পদক্ষেপ জায়েজ করা যায় না। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, কে সন্ত্রাসী তা নিরূপণ করা বা শাস্তি বিধানের এখতিয়ার কেবল আদালতের, অন্য কোনো সংস্থার নয়। তবে পরবর্তী সময়ে নিশানায় কেবল সন্ত্রাসী থাকেনি; রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ঘটনার শিকার হয়েছে, শিকার হয়েছে নিরপরাধ মানুষও।
এ প্রসঙ্গে বলা দরকার যে, আমাদের অত্যন্ত দক্ষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী রয়েছে। তারা, বিশেষ করে র‌্যাব ও পুলিশ জঙ্গিবিরোধী অভিযান, সন্ত্রাস দমন, চোরাচালান রোধ ইত্যাদি ক্ষেত্রে যে পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে বা দিচ্ছে তা প্রশংসনীয়। এজন্য তাদের বহুবার সাধুবাদ জানিয়েছি, আজও জানাই। তারপরও তারা তাদের কর্মসীমার বাইরে যাচ্ছে বা যেতে হচ্ছে।
আমরা দেখে আসছি- যখন যে দলই ক্ষমতায় আসে, তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হীনরাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে। এটি সোজা হিসাব, যখন সরকার অপকর্ম করায়, রাজনৈতিক হীনস্বার্থে ব্যবহার করে। তখন তারাও নিজেদের স্বার্থে অপকর্ম করার সুযোগ পেয়ে যায়। এভাবেই কিছু কিছু সদস্য বিপথগামী হয়, হয়েছেও। এর বড় নজির নারায়ণগঞ্জের ৭ খুনের ঘটনা।
দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে, তাদের আইনের আওতায় প্রভাবমুক্তভাবে চলতে দিতে হবে। দেশকে সন্ত্রাসমুক্ত করার আইনানুগ পদ্ধতি আছে। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবে উল্টোটাই হচ্ছে। বিএনপির শাসনকালে যখন র‌্যাব গঠিত হয়, তখন আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের শরিকরা তীব্র বিরোধিতা করেছিল। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই বলেছিলেন, তারা ক্ষমতায় গেলে ক্রসফায়ার হবে না। ২০০৮ সাল থেকে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। কিন্তু ক্রসফায়ার বন্ধ হয়নি। আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া একাধিকবার বলেছেন, র‌্যাবের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে, এটি এখন ভেঙে দেওয়া উচিত। গুম নিয়েও বিএনপি সোচ্চার।

সংবাদমাধ্যমের সংবেদনশীলতা:
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অনন্য। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যম সোচ্চার ছিল, মুক্তিযুদ্ধে সাংবাদিকদের ভূমিকা ছিল, ভূমিকা ছিল মুক্তাঞ্চল থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রেরও। স্বাধীনতা-উত্তর গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেও সংবাদমাধ্যম সহযাত্রী।
সংবাদকর্মীদের নানা প্রতিকূলতার মুখে কাজ করতে হয়। প্রথমত, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন যাদের বিপক্ষে যায়, তারাই সংবাদকর্মীদের ওপর চড়াও হয়। পুলিশ, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, মস্তান, মাফিয়াদের হাতে সংবাদকর্মীরা প্রায়ই আক্রান্ত হচ্ছেন। জীবন দিতে হয়েছে সাগর-রুনি, খুলনার হুমায়ুন কবীর বালু ও মানিক সাহা, যশোরের মাজেদুর রহমান ও সাইফুল আলম মুকুল, ফরিদপুরের গৌতম দাস, শাহজাদপুরের আবদুল হাকিম শিমুলসহ অনেককে। দুর্ভাগ্যজনক, বেশিরভাগ খুনি ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে সংবাদকর্মীদের ‘ভয়ের সংস্কৃতি’র মধ্যে বাস করতে হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, তথ্যপ্রযুক্তি আইন ৫৭ ধারায় অনেককে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। এটি বাতিল হলেও নতুন করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারার খাঁড়া উদ্যত।
তৃতীয়ত, পরিস্তিতি মোকাবেলায় সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াতে পারছে না। কারণ, সাংবাদিকরা রাজনৈতিকভাবে দ্বিধাবিভক্ত। অতীতে তফাজ্জেল হোসেন মানিক মিয়া, জহুর হোসেন চৌধুরী, আবদুস সালাম, শহীদ সিরাজউদ্দীন হোসেন, ফয়েজ আহমেদ, এবিএম মূসা, নির্মল সেন, সন্তোষ গুপ্ত, আতাউস সামাদরা সাংবাদিকতায় সততা, মেধা, সাহস ও পেশাদারিত্বের যে স্বাক্ষর রেখে গেছেন, তা আজ বিরল। অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিক নেতারা পেশাগত স্বার্থের চেয়ে অনুগত রাজনৈতিক দলের স্বার্থ রক্ষায় অধিক উৎসাহী। তদুপরি পদ-পদবি-পুরস্কার ও বিদেশ ভ্রমণের প্রলোভনে অনেকে বিভ্রান্ত। সেটিও সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে বাধা। অনেক ক্ষেত্রে বাধা মালিকপক্ষও।
এমন প্রতিকূলতার মুখে সংবাদমাধ্যমে ‘নিখোঁজে’র সংবাদ প্রকাশ করতে হচ্ছে। তাই প্রতিবেদন প্রকাশে এক ধরনের কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলতে হয়। তা সত্ত্বেও সংবাদ পড়ে ‘নিখোঁজে’র রহস্য অনুধাবনে কারও অসুবিধা হয় না। সামরিক শাসনামলে সংবাদকর্মীদের এমন মুন্সিয়ানা রপ্ত করতে হয়েছিল। যেমন স্বৈরশাসক এরশাদের আমলে যখন হরতাল লেখায় নিষেধাজ্ঞা ছিল, তখন লিখতে হতো- সকাল ৬টা থেকে ২টা ‘কর্মসূচি’ পালিত হয়েছে। শব্দবোমা বা পটকার স্থলে ‘বিকট শব্দের’ কথা লিখতে হতো। তখন আমি যশোরের একটি আঞ্চলিক পত্রিকার মুন্সিয়ানা উপভোগ করেছিলাম। পত্রিকাটি লিখেছিল- গত রাত ৮টায় শহরের মনিহার সিনেমা হলের সামনে বিকট শব্দে পর পর তিনটি ‘কর্মসূচি’ ফুটেছে। তাই আজ যখন কোনো ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাম লেখা যায় না। তখন সংবাদকর্মীদের সাদা পোশাক বা কালো পোশাক, হাতকড়া লাগানো বা গাড়ির বর্ণনা দিয়ে সত্যের দিকে ইঙ্গিত করতে হয়। এটি আমার বিবেচনায় সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সাহসিকতা। এ প্রসঙ্গে অল্প দিনের যাত্রী টেলিভিশনের কর্মীদের কথা বলতে চাই- তারা ঝুঁকি নিয়ে, জীবন বাজি রেখে ঘটনার পেছনে ছুটে চলেছেন। আমি তাদের সাধুবাদ জানাই। সাধুবাদ প্রাপ্য নাগরিক-সাংবাদিকদের; যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় মোবাইল ফোনে ধারণ করা কত অজানা তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছেন। গুম, হত্যা, ধর্ষণসহ অনেক গোপন খবর আলোর পাদপীঠে আনছেন। সোশ্যাল মিডিয়া এখন মুদ্রণ, টেলিভিশন, অনলাইনসহ সব মাধ্যমের অনেক খবরের উৎস। তবে সমূহ বিপদও আছে- হুজুগে নিরপরাধ মানুষের আস্ফালান কেড়ে নিতে পারে। ফেলে দিতে পারে জীবন-ঝুঁকিতেও।
সে যাই হোক, সংবাদমাধ্যমের বড় দুর্বলতা হচ্ছে- গুম-নিখোঁজ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরিতে পিছিয়ে আছে। যে কারণে তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বয়ানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আমি বলছি না যে, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হচ্ছে না। হচ্ছে, তবে খুবই কম। ফলোআপ নিউজ প্রকাশেও ঘাটতি আছে। এর একটা কারণ হতে পারে। ঘটনাবহুল দেশে নিত্যনতুন ঘটনা; নতুন ঘটনার নিচে পুরনো ঘটনা চাপা পড়ে যায়। তারপরও বিশেষ ঘটনা ‘ফলোআপ’ জরুরি; মানবাধিকার ও সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা সমুন্নত রাখতে এর বিকল্প নেই।
উপসংহার:
মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে। ঝরে যাচ্ছে বহু স্বজনের স্বপ্ন। হারিয়ে যাওয়া মানুষের শিশুসন্তানরা কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে অন্ধ হয়ে যাচ্ছে তাদের মা-বাবা। এমন কান্না থামানোর দায়িত্ব কার? তাদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব কার? সরকার-প্রশাসন কি এ দায়িত্ব নেবে না? রাষ্ট্র কি জননিরাপত্তা দেবে না? আমরা শুনতে চাই, আমরা বোঝতে চাই না, আর কোন দেশে কত মানুষ গুম হয়েছে; অতীতে গুম ছিল কী ছিল না!
আমরা সেই দেশের নাগরিক, যারা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়েছি, পাকিস্তানি দুঃশাসন মোকাবেলা করেছি, একাত্তরে অকাতরে রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা এনেছি। একাত্তরে আমরা সব মানুষের জন্য নিরাপদ ভূমি চেয়েছি। আমাদের চাওয়া আরও অনেক কিছু, আমাদের স্বপ্ন আকাশছোঁয়া। তবে প্রাথমিকভাবে আমরা চাই- কেউ আর হারিয়ে যাবে না, প্রত্যেকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। কেউ অপরাধ করলে তা দেখবে, শাস্তি দেবে আদালত- অন্য কেউ বা কোনো সংস্থা নয়।
কেউ কেউ অন্য দেশের সঙ্গে তুলনা করেন। বলেন, অন্য দেশের তুলনা নিখোঁজের সংখ্যা বেশি নয়। এ মন্তব্য অবান্তর। আমরা আন্তর্জাতিক কনভেশনের আলোকে রাষ্ট্রের কাছে দাবি জানাই- একজনও যেন গুমের শিকার না হয়। তবে এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ঐকমত্য থাকতে হবে যে, আইনবহির্ভূতভাবে কেউ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করবে না। প্রশ্ন আসতে পারে- রাজনীতিতে যখন আদর্শবাদ গৌণ, ছলে বলে কৌশলে ক্ষমতায় যাওয়া বা থাকাই মুখ্য, নির্বাচনসহ নানা ইস্যুতে যখন ঝগড়া চরমে; তখন এ আশা কতটুকু বাস্তব?
[এবিএম মূসা-সেতারা মূসা ফাউন্ডেশন আয়োজিত জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘সাংবাদিকতায় আজীবন সম্মাননা ও স্মারক বক্তৃতা’ অনুষ্ঠানে লেখক ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খান স্মারক বক্তা হিসেবে এ প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।]

Developed by: