সর্বশেষ সংবাদ
ফেঞ্চুগঞ্জ ইউনিয়ন ছাত্রদলের কমিটি : ঘোষণা উপজেলার, বাতিল জেলার  » «   ক্রীড়া সংগঠক আব্দুল কাদিরের মায়ের ইন্তেকাল  » «   রণবীর-দীপিকা বিয়ে নভেম্বরে?  » «   যাদুকর ম্যারাডোনার পায়ের অবস্থা করুণ  » «   একটু আগেবাগেই শীতের আগমণ  » «   চট্টগ্রামে আইয়ুব বাচ্চুর জানাযা বাদ আছর  » «   রাবণ পোড়ানো দর্শনকারী ভিড়ের উপর দিয়ে ছুটে গেলো ট্রেন : নিহত ৬০  » «   গোলাপঞ্জে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন উদ্বোধন করলেন শিক্ষামন্ত্রী  » «   বিসর্জনের দিন সিলেটে আসনে ‘দেবী’  » «   বিভিন্ন পূজা মণ্ডপ পরিদর্শনে মেয়র আরিফ  » «   সিলেটে স্বয়ংক্রিয় কৃষি-আবহাওয়া স্টেশন স্থাপিত  » «   শীতে ত্বক সজীব রাখতে শাক-সবজি খান  » «   সিলেট ওসমানী বিমানবন্দর সংস্কার হচ্ছে প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে  » «   কোম্পানীগঞ্জে টাস্কফোর্সের অভিযানে পেলোডার মেশিন জব্দ  » «   ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধনে সরকারকে নোটিশ  » «  

বৈশ্বিক খেলার অপরিহার্য খেলোয়াড় হতে চলেছে চীন



জহির চৌধুরী: :বৈশ্বিক শক্তির পালস্নায় চীনের ওজন বাড়ছে। যোগ্যতাই চীনের ওজন বাড়াচ্ছে। সুপ্রাচীন চৈনিক সভ্যতার দেশ চীন। এ সভ্যতা প্রমাণ করে সুপ্রাচীনকাল থেকেই চীনারা উচ্চমানের উদ্ভাবনী মেধা ও নেতৃত্ব গুণের অধিকারী জনগোষ্ঠি। খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে চীনাদের আবিষ্কারের ফসল কাগজ ও কম্পাস। এ দুটি আবিষ্কার বিশ্ব সভ্যতার বিকাশে রেখেছে এক কালজয়ী প্রভাব। কৃষি যুগের সূচনাতেও কৃষিতে চীনারা উদ্ভাবনী সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। চীনে ৭৭০০ বছর আগে ধানের আবাদ হয়েছে। গরম আবহাওয়ায় শীতল বাতাস দেয়ার ফ্যান চীনারা আবিষ্কার করেছে যিশুখ্রিস্টের জন্মের ২০০ বছর আগে। ১০৪৪ সালে সাং রাজবংশের আমলে চীনে প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্বের সর্বপ্রথম মিলিটারি একাডেমি। কলম্বাসের প্রায় ৭০ বছর আগে আমেরিকা আবিষ্কার করেন চীনের সিন্দাবাদখ্যাত এডমিরাল ঝেং হে। সভ্যতার বিকাশে চীনাদের অবদান সুদূর অতীত থেকেই। সুপ্রাচীন চৈনিক সভ্যতার উত্তরসূরি চীন একবিংশ শতাব্দীর জ্ঞান-বিজ্ঞান, অর্থ-সম্পদ সমৃদ্ধ শীর্ষ দেশের একটি। জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মাত্র কয়েক দশকের তাক লাগানো সাফল্য চীনকে বিশ্বশক্তির দাবিদার করেছে।
জাতিসংঘে নিযুক্ত ফিলিস্ত্মিনির রাষ্ট্রদূত রিয়াদ মানসুর সম্প্রতি বলেছেন, ‘ইহুদিবাদী ইসরাইরালের সঙ্গে শান্ত্মি আলোচনায় মার্কিন পক্ষপাতিত্বের কারণে চীনকে অন্ত্মর্ভুক্ত করতে চায় ফিলিস্ত্মিন স্বশাসন কর্তৃপক্ষ’। ইসরাইলের সঙ্গে শান্ত্মি আলোচনায় চীনকে অন্ত্মর্ভুক্ত করার ফিলিস্ত্মিনি প্রস্ত্মাবের মধ্যে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বৈশ্বিক খেলায় অপরিহার্য খেলোয়াড় হিসেবে চীন আবির্ভূত হচ্ছে বলা যায়। চীনকে অবজ্ঞা-অগ্রাহ্য করে আঞ্চলিক, বৈশ্বিক সংকট-সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়- এটাই এখন বাস্ত্মবতা। ফরাসি বীর নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ভবিষ্যতবাণী ছিল, ‘ঐবৎব রং ধ ংষববঢ়রহম মরধহঃ. উড়হ’ঃ ফরংঃঁৎন যরস. ডযবহ যব রিষষ ধধিশব, যব রিষষ ৎড়ষষ :যব ড়িৎষফ’. বীর নেপোলিয়নের ভবিষ্যতবাণী ভুল ছিল না। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে চীনের ওপর নির্ভর করা ছাড়া গত্যন্ত্মর নেই-এমন বার্তা আন্ত্মঃদেশীয় সংস্থা জাতিসংঘের কাছ থেকেই পাওয়া গেছে।
গত বছর জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি এ কে এ মোমেনের সঙ্গে আলোচনায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রেসিডেন্ট তাবেদা আলেমু রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে চীনের সমর্থন আদায়ের পরামর্শ দেন। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সংকট নিরসনের দেন-দরবারে চীনের ভূমিকা-উপস্থিতি আবশ্যক এখন। হিমালয় পাদদেশের ড্রাগন বলা হয় চীনকে। অর্থ ও প্রযুক্তি শক্তিতে চীনের দুনিয়া জোড়া ক্রমবর্ধমান দাপট হিমালয় পাদদেশে নিভৃতে থাকা ড্রাগনের নড়াচড়ার ইঙ্গিত দেয়। বিশ্বজমিনে আধিপত্য বিস্ত্মারের সক্ষমতা ইতোমধ্যে অনেকটাই অর্জন করেছে চীন। মহাকাশে আধিপত্য বিস্ত্মারেও হাটি হাটি পা পা করে এগুচ্ছে দেশটি। মহাকাশ যুদ্ধের প্রযুক্তি এখন চীনের করায়ত্ত। মহাকাশে আধিপত্য বিস্ত্মারের লক্ষ্যে চীন নিজের একক শক্তিবলে মহাকাশ স্টেশন নির্মাণ শুরম্ন করেছে প্রায় ৭ বছর আগে।
হ২০২০ সালের মধ্যে মহাশূন্যে মনুষ্য স্পেস স্টেশন নির্মাণ করতে চায় চীন। অর্থনীতিতে চীনের সাফল্যর গতি রকেট গতির সঙ্গে তুলনা চলে। ১৮৭২ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ছিল বিশ্বসেরা অর্থনৈতিক শক্তি। ওই সময় অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে যুক্তরাজ্যকে হটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সেরা স্থানটি দখলে নেয়। ২০১৪ সালে আন্ত্মর্জাতিক মুদ্রা তহবিলয়ের (আইএমএফ) প্রতিবেদনে ১৪২ বছরের বি শ্বসেরা অর্থনৈতিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়ে চীন বিশ্বসেরা অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ধারণা করা হয়েছিল, ২০৩০ সালে চীনের অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে টপকাবে।
২০১৬ সালে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন মতে, জিডিপির আকারে ২০২৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলবে চীন। এরই মধ্যে পিপিপির ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। উন্নয়নশীল বিশ্বে বিশ্বব্যাংকের চেয়েও বেশি ঋণ দিচ্ছে চীনের রাষ্ট্রীয় ব্যাংক। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ- এর বিকল্প হিসাবে চীনের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)। চীনা মুদ্রা ইউয়ান আন্ত্মর্জাতিকীকরণ হতে যাচ্ছে। পাকিস্ত্মানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ কার্যক্রমে চীনের মুদ্রা ইউয়ানকে অনুমোদন দিয়েছে। ফলে পাকিস্ত্মানে ডলারের পাশাপাশি ইউয়ান চলবে। জার্মানির কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি জানিয়েছে, তারা রিজার্ভে চীনা মুদ্রা ইউয়ান যোগ করবে। কালের বিবর্তনে বিলুপ্ত হওয়া আন্ত্মঃমহাদেশীয় বাণিজ্যপথ পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে চীন ‘নিউসিল্ক রম্নট বা ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড (ওবিওআর ) নামে। ‘ওবিওআর’ প্রকল্প বাস্ত্মবায়নের লক্ষ্যে গত বছর বিশ্বনেতাদের নিয়ে রাজধানী বেইজিংয়ে সম্মেলন করেছে চীন। দুদিনের ওই সম্মেলনে বিশ্বের ২৯টি দেশের সরকার প্রধানসহ ১৩০টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র ভারত ছাড়া সবাই অংশ নেয় ওই সম্মেলনে। সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট, হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টা, ইইউসহ প্রভাবশালী ও ক্ষুদ্রদেশগুলোর নেতা-প্রতিনিধিরা যোগ দিয়ে চীনের ‘ওবিওআর’ প্রকল্পে সমর্থন দিয়েছেন, অংশীদার হতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। গত বছর চালু হয়েছে লন্ডন-বেইজিং সরাসরি রেলপথ। এই রেলপথ দিয়ে মাত্র ১৮ দিনে পণ্য পৌঁছাবে দুই দেশের রাজধানীতে। চীনের সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোর বাণিজ্যিক সর্ম্পক দিন দিনই ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। চীন এখন বিশ্বের উন্নত-অনুন্নত, উন্নয়নশীল দেশগুলোর গুরম্নত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পার্টনার। ইংরেজ ভূগোলবিদ স্যার ম্যাকিন্ডার গত শতব্দীর গোড়ার দিকে এক নিবন্ধে ভবিষ্যৎ চীন সম্পর্কে বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি কোনো এক সময়ে চীনের ভৌগলিক উত্থানের পরিণতিতে চীন বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ মানবগোষ্ঠির এক নতুন সভ্যতার উদ্ভব ঘটাবে যা সম্ভবত প্রাচ্য ও পাশ্চত্য সভ্যতার কোনোটারই ছাঁচে হবে না’।
‘ওবিওআর’ বাস্ত্মবায়নের লক্ষে আয়োজিত সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বিশ্ব নেতাদের উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে সংরক্ষণবাদ প্রত্যাখানের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘রাজহাঁস ঝড়ের মধ্যেও বাতাসে অনেক দূর উড়তে পারে। কারণ, তারা দলবদ্ধভাবে উড়ে এবং প্রত্যেকে একটি টিম হিসেবে দলকে সহযোগিতা করে’। পারস্পরিক সহযোগিতাকে গুরম্নত্বপূর্ণ মনে করে চীন, পশ্চিমাদের মতো একপেশে স্বার্থের মিত্রতা-সহযোগিতা চীনের নীতি নয়-এ বার্তাই এসেছে চীনা প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে। চীন-ভুটান সীমান্ত্মের দোকালামে সড়ক নির্মাণ নিয়ে ভারত ও চীনের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজকালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান লে. জে. শরথ চান্দ বলেছেন, ‘বিশ্ব কেবল সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিকে মেনে চলে’। সামরিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চীন সমীহ আদায়ের পর্যায়ে চলে গেছে-এটা বাস্ত্মবতা।
বর্তমানে চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে সংখ্যক শিক্ষার্থী রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র্র ও ইউরোপের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে সে সংখ্যক শিক্ষার্থী নেই। প্রতিযোগিতার বিশ্বে নেতৃত্ব দেয়ার উপযুক্ত প্রজন্ম গড়ার ক্ষেত্রেও চীন পিছিয়ে নেই। চীনে উচ্চশিক্ষার মান উন্নতি প্রমাণ করে আন্ত্মর্জাতিকর্ যাংকিংয়ে চীনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান সূচকের ঊর্ধ্বমুখী ধারায়। বর্তমানে চীনের প্রযুক্তি পণ্য রপ্তানি আয় যুক্তরাষ্ট্রের একই ধরনের পণ্য রপ্তানি আয়ের প্রায় চার গুণ। এটা সুলভে অগ্রসর প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতার ফল। এশীয়বিষয়ক ব্রিটিশ গবেষক মার্টিন জ্যাকস তার ‘হোয়েন চায়না রম্নলস দি ওয়ার্ল্ড: দি রাইজ অব দি মিডল কিংডম আ্যন্ড দি আ্যন্ড অব দি ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড’ গ্রন্থে উলেস্নখ করেছেন, ‘একুশ শতকে কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশ বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করবে। এদের মধ্যে চীন এক নম্বরে’। কারণ হিসেবে বলেছেন, ‘চীন যতটা না জাতি রাষ্ট্র তার চেয়ে বেশি সভ্যতাভিত্তিক রাষ্ট্র’। প্রায় ৫৫ জাতি ও উপজাতির কমবেশি দেড় শতাধিক কোটি মানুষের দেশ চীন। জ্ঞান-বিজ্ঞান,প্রযুক্তি-অর্থনীতিতে দেশটি যেভাবে এগুচ্ছে তাতে বৈশ্বিক খেলোয়াড় ও চ্যালেঞ্জার হিসেবে আবির্ভূত হওয়া স্বাভাবিক ঘটনাই।
পশ্চিমারা প্রায় এক দশক আগেই স্বীকার করেছে চীনের উত্থানে তাদের দরকষাকষির শক্তি কমেছে। পরবর্তী একদশকে পশ্চিমাদের এ শক্তি আরও কমেছে তা বলা প্রয়োজন পড়ে না। ২০১৫ সালে চীনের বেইজিং বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া ভাষণে মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ এডমিরাল মাইক মুলেন বলেছেন, ‘চীন এখন বিশ্ব শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এক সময় যুক্তরাষ্ট্র চীনকে উদীয়মান শক্তি হিসেবে অবিহিত করত, যা এখন অতীত। চীন এখন আর উদীয়মান দেশ নয়। আসল সত্য হচ্ছে- চীন বিশ্ব পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে’। দীর্ঘ ২০ বছর চীনের সামরিক শক্তি নিয়ে গবেষণা করা মার্কিন গবেষক রিক ফিশার বলেছেন, ‘চীন ২০২০ সালের মধ্যে এমন একটি সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলতে চাইছে যাদের বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত্মে মোতায়ন করা যাবে’। নবোত্থিত পরাশক্তি চীন বৈশ্বিক খেলার অপরিহার্য খেলোয়াড় হতে যাচ্ছে-তার বার্তা পরিষ্কারই।

জহির চৌধুরী: কলাম লেখক

Developed by: