সর্বশেষ সংবাদ
ইলিয়াছ আলীর গাড়ি চালক আনসার আলীর মা-মেয়ে আজও অপেক্ষায়  » «   কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সংবাদ সম্মেলন : সাত দিনের মধ্যে মামলা প্রত্যাহার না করলে ক্লাস বর্জন  » «   ‘করের আওতায় আনা হবে সিএনজি অটোরিকশা মালিকদের’  » «   দীর্ঘ ২৫টি বছর পর…  » «   অবশেষে আরব আমিরাতে খুলেছে বাংলাদেশের শ্রমবাজার  » «   বালাগঞ্জে ‘দেশরত্ন শেখ হাসিনা সেতু’র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন  » «   দক্ষিণ সুরমায় জোড়া খুনের মামলায় ৪৯ জন কারাগারে : ২ জনের জামিন  » «   প্রেমের টান বড় জোরদার : যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফরিদপুর  » «   অর্ধ মানুষরূপী এটা কি?  » «   ফের আলোচনায় ডিআইজি মিজান : সংবাদ পাঠিকাকে ৬৪ টুকরো করার হুমকি  » «   গোলাপগঞ্জে হামলার শিকার তরুণের মৃত্যু  » «   সাবেক মার্কিন ফার্স্ট লেডি বারবারা বুশ নেই  » «   ৪০ গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে ফুটবল বিশ্বকাপের টিকেট!  » «   প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনে পৌঁছেছেন  » «   চাঁদ দেখা কমিটির বৈঠক আজ  » «  

হাজার বছরের বাংলা



মুস্ত্মাফা নূরউল ইসলাম :প্রায়ই আমরা বলে থাকি হাজার বছরের বাংলা, হাজার বছরের বাংলা কবিতা গান, হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি। ইত্যাকার উচ্চারণ আমাদের গর্বের সম্পদ। হিসাবটা অবশ্য অঙ্ক গণনায় নয়, আসলে বোঝাতে চাই যে, সুদূর অতীত কালাবধিই বিপুল সমৃদ্ধ আমাদের পিতৃপুরম্নষের তাবৎ মহান কৃতীর অর্জন। সচেতন জনের জানা রয়েছে, একটি জাতির জন্য সুস্থ সুন্দর জীবনে বেঁচে থাকার স্বার্থে এবং সেইসঙ্গে উত্তর-প্রজন্মের মানসভাবনায় তা বাহিত করে দেয়ার লক্ষ্যে আপন ঐতিহ্যজাত গর্বচেতনার বড় প্রয়োজন। সেইটেকে আবিষ্কার করতে হয়, সুস্পষ্ট পরিচিতিতে চিহ্নিত করতে হয়। কালে কালে দেশে দেশে এমনটিই হয়েছে।
এশিয়া ভূখ-ে যেমন ইরান। সপ্তম শতাব্দীর হজরত উমরের সময়কালে ইরানে আরব আধিপত্য স্থাপিত হয়। সেটা কেবল রাজনৈতিক অধিকার মাত্র ছিল না, স্বল্পকাল ব্যবধানে সমগ্র ইরানেরই চরিত্রবদল ঘটে- ধর্মে, ভাষায়, এবং সংস্কৃতির অঙ্গনেও। শ’ দুই বছরের অন্ত্মে ইরানের যখন নবজাগরণ, পরাধিপত্য বিতাড়িত, ইরান তখন আবিষ্কার করতে চাইছে তার আপন ঐতিহ্যের গৌরব-সম্পদকে। এক্ষেত্রে উজ্জ্বলতম নিদর্শন মহাকবি ফেরদৌসীর (খ্রি. ৯৪০-খ্রি. ১০২০) ‘শাহনামা’। রচনার ভাষা স্বদেশের ইরানি, বিষয়বস্তু পুরাণের- ইতিহাসের ইরান খ্রি. পূ. ৩৬০০ অব্দ থেকে প্রাক্‌-আরব বিজয় কালাবধি তা প্রসারিত। আরবাধিকারমুক্ত ইরান অবলম্বনে খুঁজছে তার অতীত গর্বের ভুবনে। পিছিয়ে গিয়ে আবদ্ধ হওয়ার জন্য নয়, এগিয়ে যাওয়ার প্রাণ-প্রেরণার উৎস সন্ধানে। ইউরোপে তেমনি ইতালিতে, রেনেসাঁর সূতিকাগার যেখানে। অন্ধকারাচ্ছন্ন মধ্যযুগের অবসানে ধ্রম্নব নক্ষত্রের আলোকের দিশা পেয়েছিল ওই হাজার বছরের আকাশে। তাই নতুন করে আপন সভ্যতা নির্মাণের কর্মকা-ে ইতালি উপকরণ সংগ্রহ করেছিল প্রাচীন গ্রিক রোমান সভ্যতার আদল থেকে। প-িত, চিন্ত্মাবিদ, শিল্পী, সাহিত্যিক সবাই দ্বারস্থ হয়েছিলেন ওই প্রাচীনের উৎসভা-ারে- তাগিদটা ছিল নতুনের সৌধ নির্মাণ। তারপর সমগ্র পশ্চিম ইউরোপজুড়েই কী বিস্ময়কর অর্জন জীবনের সর্বত্র- ভাষায়, সাহিত্যে, সংগীতে- শিল্পে, মানসভাবনায়, আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক সমুদয় ক্ষেত্রে। তদাঞ্চলে ইহজাগতিক চেতনায় উদ্বোধন বিকাশ ঘটেছে। ধর্ম এবং আধ্যাত্মিকতার নতুন করে ব্যাখ্যা হয়েছে এবং রক্ষণশীলতার অন্ধত্বকে চ্যালেঞ্জ করে যুক্তির কথা উঠেছে। মৌলবাদের বিধিনিষেধাজ্ঞা তীক্ষ্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে।
এখন প্রসঙ্গ আমাদের আপন ভুবন বাংলাদেশ। একালে, পূর্বকালে। জিজ্ঞাস্য, এতদাঞ্চলে ওই প্রভাবের কর্মকা- কতটা সাধন করা গেছে? বাংলাদেশের মানুষের জীবনেও কি ইরানের অনুরূপ দশম শতাব্দীর কাল কিংবা ইতালি-পশ্চিম ইউরোপের চতুর্দশ-সপ্তদশ শতাব্দীর কাল আসেনি? স্বদেশভূমির এবং জনপদবাসীর ‘হাজার বছরে’র সন্ধানে কদাপি কী উদ্যোগী হয়ে ওঠা গেছে? বিবেচনা করি যে, প্রশ্নটি পরীক্ষা করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। তবে জানা কথা, মানুষ বলেই তার স্বভাব বোধহীন, নিরেট, জড়বস্তু মাত্র নয়। আর মানুষ বলেই সে অনুসন্ধিৎসায় তাড়িত হবে এবং কালপ্রবাহের কোনো এক মাহেন্দ্রলগ্নে জনগোষ্ঠীর সবাই মিলে ইতিহাসের পালাবদলের কর্মযজ্ঞে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করবে।
এটি যথার্থ বটে। আমাদের ক্ষেত্রেও অন্যথা হয়নি। সার্থক সেই কর্মকা- অতি সাম্প্রতিককালের। অনেকেরই আপন অভিজ্ঞতা- শতাব্দীর মধ্য প্রহরে আমাদের ভাষা আন্দোলন দিয়ে তার সূচনা। বলা বাহুল্য, সুস্পষ্ট করে মাতৃভাষা চেতনার উদ্বোধনের সঙ্গেই অঙ্গাঙ্গি সম্পর্কিত হয়ে এসেছে স্বজাত্যবোধ আর ওই ‘হাজার বছরে’র ঐতিহ্য-উত্তরাধিকারের প্রেরণা। সবটা মিলিয়ে অবশেষে উত্তরণ মুক্তিযুদ্ধের একাত্তরে। স্মরণ করি পাকিস্ত্মানি দুঃশাসনের নিষ্ঠুর দিনগুলো। আগ্রাসী শক্তির দাপট আমরা মেনে নিইনি, আমরা হার মানিনি। এখনো প্রত্যক্ষ করি ছবিটা ছিল এই রকমের- ‘বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারদিকে।’ ততদিনে এই বাংলার কোটি মানুষ নিশ্চিত করে চিনে নিয়েছে আপন ঠিকানাটি- ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’। সেটা অবশ্যই নয়, হাজার দেড় হাজার মাইল ব্যবধানের দূরস্থির বৈরী প্রকৃতির ঊষর এক বিদেশভূমির সঙ্গে কৃত্রিম জোড়-দেয়া অবস্থান। কদাপি বিস্মৃত হবো না ওই কোটি মানুষ পবিত্রতম আন্ত্মর-বিশ্বাসেই মাতৃভূমি স্বদেশের জয়ধ্বনি উচ্চারণ করেছিল ‘জয় বাংলা’। সে ছিল নিবেদিতপ্রাণের মৃতু্যঞ্জয়ী মন্ত্র। সেই কঠিন সময়ে বীর বাঙালি অস্ত্র ধরেছিল, মাতৃভূমিকে শত্রম্নমুক্ত স্বাধীন করেছিল। এটা তো শেষের অধ্যায়। পূর্বকথা কী?
আমাদের পিতৃপুরম্নষের কর্মকা-ের ইতিহাস অধ্যয়নের প্রয়োজন বোধ করছি। আসলে বংশ পারম্পর্যের প্রবহমানতার সঙ্গেই তো অবিচ্ছেদ্য আমরা। অন্যথায় বর্তমানের আমাদের সত্তা ভাসমান, তৃণমূলচু্যত।
অতএব, পিতৃপুরম্নষের কথা। লক্ষণীয় যে, তাদেরও আত্মপরিচিতিবোধের জাগরণ ওই মাতৃভাষাচেতনা দিয়েই। মাতৃভাষাচেতনা এবং তৎসহ স্বদেশচেতনা। সেই প্রমাণ-সাক্ষ্য পাই চারশ’ বছর আগের কবি সৈয়দ সুলতানের লেখায়- ‘যারে যেই ভাসে প্রভু করিল সৃজন। সেই ভাসা তাহার অমূল্য যত ধন।’ প্রশ্ন, কবিকে এমন চরণ কেন রচনা করতে হয়? তাহলে সেইকালেও বৈরী ক্ষমতার ছিল এই প্রকারের নির্দেশ-উদ্যোগ যা প্রাকৃত সাধারণ বাঙালি মুসলমানের জন্য মাতৃভাষা বর্জনে প্রয়াসী হয়েছিল। অন্যথায় সৈয়দ সুলতানকে সৃজনকর্তা ‘প্রভু’র দোহাই দিতে হচ্ছে কেন? একই কবিতাংশে তিনি নানা মুসলিম দেশের নামোলেস্নখ করে সেই সমস্ত্ম দেশের মানুষ- পরিচিতি এবং তাদের মাতৃভাষা-পরিচিতির উলেস্নখ করে জানাচ্ছেন যে আরবের বাসিন্দার জন্য রয়েছে আরবি, খোরাছানের জন্য খোরাছানি, রম্নম দেশের জন্য রম্নমি, তুর্কস্থানের তুর্কি, শামের শামি ইত্যাদি। অতঃপর কী আমাদের পিতৃপুরম্নষ ওই বাঙালি কবির কথন- উদ্দেশ্য অস্পষ্ট থাকে? পরের শতাব্দীতে আবদুল হাকিম অধিকতর স্পষ্টবাক্‌ হয়েছেন। তিনি ‘দেসি ভাসা’র (দেশি ভাষা) কথা বলেছেন, এবং আরও যোগ করছেন পুরম্নষাণুক্রমে স্বদেশের কথা ‘মাতাপিতা মোহো ক্রমে বঙ্গেত বসতি’। কী দুর্ভোগ আমাদের পিতৃপুরম্নষের রীতিমতো ঘোষণা করেই তাদের জানাতে হয়েছিল- এই আমার মাতৃভূমি এই আমার মাতৃভাষা।
মোট কথা, স্বদেশ সূত্রে, বংশধারা সূত্রে, মাতৃভাষার সূত্রে, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার সূত্রে আমাদের পিতৃপুরম্নষ যে হাজার বছরের বাংলার সন্ত্মান, এই পবিত্র বিশ্বাসটি মধ্যযুগ কালাবধিই মূল সম্পৃক্ত হতে দেয়া হয়নি। সমাজ-অবস্থানে উচ্চশ্রেণির মানুষ এবং মোলস্না নামধারী গোঁড়ারা বারংবার প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছেন উৎসে প্রত্যাবর্তনের উদ্যোগের পথে। এসব কিছুই করা হতো ওই পবিত্র ধর্মের নামে। আর আমাদের জানা রয়েছে যে, কৃষিনির্ভর বাংলার সর্বস্বরিক্ত, সর্বপ্রকারেরই অসহায় মানুষের কাছে পারলৌকিক প্রাপ্তির আবেদন কত গভীর এবং ব্যাপক। বোধগম্য যে, এই প্রতিকূল পরিবেশে ইহজাগতিকতার স্বদেশচেতনা-স্বাজাত্যবোধের উদ্বোধন ঘটানো বড় সহজ কর্ম ছিল না। বলতে গর্ব অনুভব করছি, আমাদের অভিজ্ঞতায় যেমন আটচলিস্নশ থেকে বায়ান্ন, বর্তমান শতকের তৃতীয় দশক নাগাদ তেমনি আমাদেরই পূর্ব-প্রজন্ম একদল বিশ্বাসী আপসহীন কর্মী তৎপ্রকারের কঠিন দায়িত্ব স্বীকার করে নিয়েছিলেন। মাতৃভাষার প্রশ্নে, স্বাদেশিকতার প্রশ্নে তারা হাজার বছরের বাংলাকে চিহ্নিত করার মহৎ কর্মে সচেষ্ট হয়েছিলেন। হাজার বছরের বাংলা। কথাটা অবশ্যই আলঙ্কারিকার্থে নয়, সুভাষণ উক্তিও নয়। ইতিমধ্যে বারংবার এসেছে সে কথা। এবং আমরা জেনেছি মাতৃভূমি দেশের প্রসঙ্গে জনপদবাসী পুরম্নষানুক্রমিক মানুষের প্রসঙ্গে, সেই মানুষের মাতৃভাষার প্রসঙ্গে ‘হাজার বছরের বাংলা’ সত্যটি উচ্চারিত হয়েছে।
হাজার বছর বলতে সহজেই আসবে কালব্যাপ্তির প্রশ্ন। আর বাংলা বলতে ত’ দেশখ-। এবং এইকাল পটভূমিতে বাংলা নামক জনপদের অধিবাসী মানুষের প্রসঙ্গ। যা কিনা সূচনা-লগ্নাবধি কালে-কালান্ত্মরে সেই বিশেষ মানবসৌধ গড়ে ওঠার কথা, সেই সব মানুষের কর্মকা–কীর্তির কথা, তাদের চারম্ন-কারম্ন শিল্প, সংগীত-নৃত্য, সাহিত্যকর্ম, তাদের জীবনাচরণ আর ধর্মাচরণ, তাদের মানসভাবনার কথা। এই সমস্ত্মটা মিলিয়ে তবে স্বতোৎসারিত কেমন আমাদের গর্বের উচ্চারণ ‘আবহমান বাংলা’।
কত প্রাচীন এই বাংলা নামে দেশ? সে জবাব মহাকালের। তবে তিন হাজার বছরেরও অধিককাল পূর্বের ঋগ্বেদ আরণ্যকে ‘বঙ্গ’ শব্দটির উলেস্নখ পাওয়া গেছে। পু-্রভূমির কথা জানা গেছে। তার সঙ্গে পরবর্তীকালে যুক্ত হয়েছে উপবঙ্গ, চন্দ্রদ্বীপ, হরিকেল, সমতট ইত্যাদি নামচিহ্নিত জনপদ। এই কয়েকটি জনপদের সমন্বয়ে যে অঞ্চল, সেইটেই আজকের পরিচিতিতে বাংলাদেশ। আর মানুষ? নৃতত্ত্বের ইতিহাসের প-িতজনের মতে বাংলাদেশের মানুষ সঙ্কর শ্রেণির। বহু রক্তের সংশ্রিণে গড়ে উঠেছে এখানকার জনসৌধ- প্রত্ন প্রাচীনকাল থেকেই যেন ‘কেহ নাহি জানে কার আহ্বানে/শত মানুষের ধারা/দুর্বার স্রোতে এল কোথা হতে/সমুদ্রে হল হারা’। জানা গেছে, সেই প্রাগৈতিহাসিককালে আদিতে অধিবাসী যারা ছিল, উত্তর ভারতের আর্যকথিত তারা ব্রাত্য, তারা পতিত। সহজবোধ্য করে সাধারণ অভিধায় তারা অনার্য। উদ্ধার করা গেছে যে, দ্রাবিড়, আদি অস্ট্রেলীয়, আদি নর্ডিক, আলপো-দীনারীয় ইত্যাদি গোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করতো এতদঞ্চলে। উত্তরপুরম্নষে তাদের নিদর্শন হয়তো বা সামান্য কিয়ৎ পরিমাণে রয়ে গেছে রক্তে, দেহাঙ্গের কোথাও কোথাও। তবে স্পষ্টত রয়েছে বাংলার ভাষার শব্দভা-ারে, গ্রাম-নদী ইত্যাদির নাম-পরিচিতিতে এবং অনেক লোকাচারে।
দ্বিতীয় পর্বে এসেছে আর্যপ্রবাহ উত্তরাপথ থেকে মৌর্য যুগে। সেই থেকে বাংলাদেশের আর্যীকরণ বিশেষ করে ভাষায়, সংস্কৃতিতে, ধর্মাচরণে। তৃতীয় পর্বে দশম শতাব্দী নাগাদ এবং পরবর্তী তিনশ’ বছরে আরও দূর থেকে আরব-আফগান-ইরানি-তুর্কি-মোগলদের আগমন। বাণিজ্যের স্বার্থে এসেছিল আরব বণিকরা। এসেছিলেন সুফি দরবেশ মধ্যপ্রাচ্যের কোনো কোনো দেশ থেকে, তারা ইসলাম প্রচারে ব্রতী ছিলেন। আর ছিল তুর্কি-পাঠান-মোগলদের রাজ্য বিস্ত্মারের অভিযান। স্বভাবতই সেই সব অভিঘাতে এবং শেষ অবধি যারা এদেশে স্থায়ী হয়ে গিয়েছিল তাদের প্রভাবে প্রচুর পরিবর্তন আসে এতোকালের দেশজ সমুদয় ক্ষেত্রে। পরিবর্তন আসে সংঘাত-সমন্বয়-মিশ্রণের মাধ্যমে। ভাষায় বিশেষ করে আরবি-ফার্সি-তুর্কি শব্দসম্ভারের সংযোজন, জীবন ও ধর্মের আচরণে লোকজ উপকরণের সঙ্গে মুসলিম দেশসমূহ থেকে আনীত ইসলামী উপকরণের সংমিশ্রণ। অন্যদিকে
সুকুমার শিল্পসাহিত্য-চর্চার ক্ষেত্রেও সাধিত হয়েছিল মিথস্ক্রিয়া। স্পষ্টভাবেই সে নিদর্শন রয়ে গেছে কবিতায়, গানে, প্রবাদে, ছড়ায়, স্থাপত্যে ও অন্যান্য নির্মাণ কর্মে। আসলে ছয়-সাত শ’ বছর ধরেই চলতে থাকে গ্রহণ-বর্জনের মাধ্যমে সমন্বয়ের পালা। মাঝে কিয়ৎকালে অনুপ্রবেশ ঘটেছিল ডাচ-পর্তুগিজ বণিক, ধর্মপ্রচারক মিশনারিদের। তারাও রেখে গেছে কিছু। অবশেষে উনিশ শতকাবধি ইংরেজবাহিত প্রভাব। এই করে করে সমগ্রতায় বাঙালি বৈশিষ্ট্যের সৌধনির্মাণ।
বলা গেছে, হাজার বছরের আমাদের সমুদয়। পুনরায় স্মরণ করি- সেই পরিচিতি বাস্ত্মবেই ত’ আমাদের এই আপন স্বদেশ ভূখ-ে। দ্বিতীয়ত, ভাষার সঞ্চয়ে শব্দরাজি সেই অনার্য কালাবধি। তৃতীয়ত, আমাদের উত্তরাধিকার পূর্বপুরম্নষের তাবৎ স্থাপত্যকর্মে মহাস্থানগড়-পাহাড়পুর-ময়নামতি-কান্ত্মজীর মন্দিরে, মসজিদ নির্মাণগাত্রে, পীর দরবেশ আউলিয়ার অসংখ্য মাজারের নির্মাণশৈলীতে। তৃতীয়ত, সৃজনশীল সাহিত্যে সঙ্গীতে। চতুর্থত, আমাদের ধর্মাচারে-জীবনাচরণে।
এভাবে ধূসর অতীতের উৎসমুখ থেকে এবং কাল থেকে কালান্ত্মরে বহমানতায় হাজার বছরের ঐশ্বর্য গর্বকে আমরা ধারণ করে থাকি।

মুস্ত্মাফা নূরউল ইসলাম: শিক্ষাবিদ, অধ্যাপক ও বুদ্ধিজীবী

Developed by: