সর্বশেষ সংবাদ
ফেঞ্চুগঞ্জ ইউনিয়ন ছাত্রদলের কমিটি : ঘোষণা উপজেলার, বাতিল জেলার  » «   ক্রীড়া সংগঠক আব্দুল কাদিরের মায়ের ইন্তেকাল  » «   রণবীর-দীপিকা বিয়ে নভেম্বরে?  » «   যাদুকর ম্যারাডোনার পায়ের অবস্থা করুণ  » «   একটু আগেবাগেই শীতের আগমণ  » «   চট্টগ্রামে আইয়ুব বাচ্চুর জানাযা বাদ আছর  » «   রাবণ পোড়ানো দর্শনকারী ভিড়ের উপর দিয়ে ছুটে গেলো ট্রেন : নিহত ৬০  » «   গোলাপঞ্জে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন উদ্বোধন করলেন শিক্ষামন্ত্রী  » «   বিসর্জনের দিন সিলেটে আসনে ‘দেবী’  » «   বিভিন্ন পূজা মণ্ডপ পরিদর্শনে মেয়র আরিফ  » «   সিলেটে স্বয়ংক্রিয় কৃষি-আবহাওয়া স্টেশন স্থাপিত  » «   শীতে ত্বক সজীব রাখতে শাক-সবজি খান  » «   সিলেট ওসমানী বিমানবন্দর সংস্কার হচ্ছে প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে  » «   কোম্পানীগঞ্জে টাস্কফোর্সের অভিযানে পেলোডার মেশিন জব্দ  » «   ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধনে সরকারকে নোটিশ  » «  

একুশের চেতনা হোক জাতীয় মুক্তি ও জনগণের সংগ্রামের প্রেরণা!



বাংলাদেশের জনগণের জাতি হিসেবে বিকাশ এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে মহান একটি অধ্যায় হল ভাষা আন্দোলন। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী ’৪৭ এর তথাকথিত স্বাধীনতা লাভের পর পূর্ব বাংলার ওপর শোষণ বৈষম্য পাকাপোক্ত করার লক্ষ্যে প্রথম আঘাতটি হানে মাতৃভাষার ওপর। এর বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই ছাত্র সমাজ সোচ্চার ছিল। ছাত্রসহ ব্যাপক জনগণের বিরোধিতা সত্ত্বেও উর্দূকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করার জন্য শাসক শ্রেণী মরিয়া হয়ে উঠলে তীব্র বিরোধ ছড়িয়ে পরে, স্পষ্ট হয়ে পড়ে জনগণের সত্যিকার শত্রু-মিত্র। তৎকালের আওয়ামী মুসলিম লীগ (বর্তমান আওয়ামী লীগ) এর মিত্র সংগঠন মুসলিম ছাত্রলীগের নেতৃত্বে গঠিত রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার বিরোধিতা করে। এই সুবিধাবাদী আচরণের বিরোধিতা করে ভাষা মতিন (আবদুল মতিন) এর নেতৃত্বে ব্যাপক ছাত্র-জনতার “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি” ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত নেয়। বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের নির্বিচার গুলিতে বুকের রক্ত দিয়ে জীবন দিয়ে সালাম বরকতেরা প্রতিষ্ঠা করে মাতৃভাষার অধিকার। একদিকে এ আন্দোলন যেমন ছিল সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্রে চাপিয়ে দেওয়া পাকিস্তান থেকে এদেশের জনগণের মুক্তির আকাঙ্খার প্রতীক আবার জনগণের একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য সংগ্রামের প্রথম স্ফুলিঙ্গ। ’৫২,’৬৯ এর মধ্য দিয়ে জনগণের সেই আকাঙ্খা প্রস্ফূটিত হয়। এদেশের জনগণ’৭১ এ পাকিস্তানিদের সশস্ত্র আগ্রাসনের বিপরীতে জাতীয় মুক্তির জন্য প্রাণপণে ঝাঁপিয়ে পড়েন, লাখে লাখে শহীদ হন। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তে জনগণের কাঙ্খিত মুক্তি ও গণতন্ত্র অধরাই থেকে যায়। কারণ এদেশের জনগণ পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর হাত থেকে মুক্তি পেলেও অসাম্প্রদায়িকতার লেবাসধারী সামন্তীয় সাম্প্রদায়িক এদেশের জমিদার ও সাম্রাজ্যবাদের দালাল ধনিক শ্রেণীর হাতে পুনরায় পরাধীন হয়ে পড়ে। ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও জাতীয় মুক্তির আকাঙ্খা ভুলুণ্ঠিত হয়। সত্যিকারের দেশপ্রেমিক ব্যাপক ছাত্র-জনতার মহান সংগ্রাম ও আত্মদানের বিনিময়ে মাতৃভাষা রক্ষা পায়, কিন্তু এই প্রকৃত ইতিহাস আড়াল করে (পাঠ্য পুস্তকে, প্রচার মাধ্যমে, প্রতিক্রিয়াশীল বুদ্ধিজীবীদের বক্তব্যে) এর মালিকানা দাবি করে সেদিনের প্রতিক্রিয়াশীল, পশ্চাৎপদ শক্তিগুলো, বর্তমান শাসকশ্রেণীর বড় একটি অংশ।
প্রতিবারের মত এবারও ২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপনের পর প্রচার মাধ্যমে সংবাদ আসবে “যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাব গাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালিত হল মহান ২১ ফেব্রুয়ারি………”। কিন্তু আমরা দেখব রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ‘কড়া নিরাপত্তা’র মধ্য প্রভাত ফেরিতে লাখো মানুষের ঢল, ব্যান্ড সংগীতের জমজমাট আড্ডা, ‘ভাষার প্রতি ভালোবাসা’ মার্কা বক্তব্য্য দিয়ে দিনটি ছিল শুধুই ভাষার, মোবাইল অপারেটর, ড্রিংকস কোম্পানীসহ বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপনী রঙ্গিন পোস্টার (চেহারায় ২১ ফেব্রুয়ারির শুভেচ্ছা বলে ভুল হতে পারে), সারাদিন ব্যাপী শাসকশ্রেণীর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের রুটিন কর্মসূচি (মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান)। আর এটাই হল শাসকশ্রেণীর যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্য প্রদর্শনের নমুনা।
গঠন, উৎস ও বর্ণমালার দিক থেকে অন্য যে কোন ভাষার তুলনায় বাংলা অনেক বিকশিত ও সমৃদ্ধ একটি ভাষা। আবার ভাষার দিক থেকে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা বিশ্বে জার্মান, ফরাসি, জাপানির চেয়ে অনেক বেশি। অথচ ওই সব দেশে ইংরেজি বা অন্য ভাষা চলে না। আর সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের কাছে পরাধীনতার কারণে উপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থা, চাকরি, রাষ্ট্রীয় কাজে ইংরেজির বাধ্যতামূলক ব্যবহার বাংলা ভাষার মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করে। রেডিও জকিদের ইংরেজি স্টাইলে বিকৃতভাবে বাংলা বলা, ডিজুস সংস্কৃতির ইংরেজিতে বাংলা লেখার চর্চা, সংবাদপত্রের বিবৃতিতে বাংলায় ইংরেজি শব্দ লেখার চর্চা, আর কথা বলার সময় বাংলার সাথে হরদম ইংরেজি মিশ্রন আজকে শিক্ষিত সমাজের তথাকথিত একটি অংশের ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। যথেচ্ছা হিন্দি ভাষার ব্যবহারেও তারা পিছিয়ে নেই। যা আমাদের জাতি হিসেবে দেউলিয়াত্বের পরিচয় দেয়। আর এভাবেই বিপন্ন হচ্ছে পৃথিবীর ইতিহাসে জীবনের বিনিময়ে অর্জিত মাতৃভাষা বাংলা। সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের পরিণতিতে আত্মপরিচয়হীন বিপন্ন জাতিতে পরিণত হচ্ছি আমরা। এদিকে সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের দালাল শাসকশ্রেণী এই চর্চাকে পৃষ্ঠপোষকতা করছে, “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” এর সাম্রাজ্যবাদী স্বীকৃতিতে গৌরব প্রচার করে ফেব্রুয়ারিকে কেবলই ভাষার মাস বলে চালিয়ে দিচ্ছে। ২১ ফেব্রুয়ারিকে নিছক অনুষ্ঠান সর্বস্ব উৎসবের দিনে পরিণত করে এর প্রকৃত সংগ্রামী চেতনা থেকে জনগণকে অন্ধকারে রাখছে। দিনটি ছিল শুধুই ভাষার কিংবা কেবল ’৭১ এর প্রেরণা বা পুরো আন্দোলনকে শুধুই “ত্রিশ মিনিট” এর মাঝে বন্দী করে সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে জনগণের মুক্তি সংগ্রামের চেতনা থেকে একুশের চেতনাকে পৃথক করার চক্রান্ত করছে।
একাত্তরে মানুষ অকাতরে রক্ত দিল মুক্তির জন্য। কিন্তু বিনিময়ে পেল নতুন এক ফ্যাসিস্ট শাসন। শাসক শ্রেণীর দল-উপদলগুলোর মধ্যে প্রথম দিন হতে শুরু হয় ক্ষমতার জন্য কামড়াকামড়ি। বাকশালী শাসন, সামরিক গণতন্ত্র শেষে শাসক শ্রেনী জনগণকে উপহার দিল সামরিক স্বৈরাচার। দেশে এখন চলছে পার্লামেন্টারি স্বৈরাচারের দিন। আগুনে পুড়িয়ে ও নির্বিচারে গুলি করে শ্রমিক হত্যা, ক্রসফায়ারের নামে আইনি খুন, রূপগঞ্জ-আড়িয়ল বিলে ভুমি দখল, পাহাড়ে গনহত্যা, উপনিবেশিক শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন, ভারতের সাথে তাবেদারীর চুক্তি, কয়লা নীতি, মডেল পিএসসি-র মধ্য দিয়ে বিদেশীদের হাতে দেশের জাতীয় সম্পদ তেল-গ্যাস-কয়লা তুলে দেয়া দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, পাকিস্তান কালেও এ দেশে যা সম্ভব হয়নি সেই মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এমন নতুন নতুন আইটেম যুক্ত হয়ে শাসক শ্রেনীর স্বেচ্ছাচারিতা চরমে পৌঁছেছে।
যেই পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে ভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তর পর্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল এক সংগ্রামের ইতিহাস এদেশের জনগণ রচনা করেছে, এদেশের শাসকশ্রেণী সে ইতিহাস অস্বীকার করে, পাহাড়সহ সারাদেশে ক্ষুদ্রজাতিস্বত্ত্বার ওপর জাতিগত নিপীড়ন বহাল রেখেছে।
তাই আজ সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, মধ্যবিত্তসহ ব্যাপক জনগণের একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াই আসন্ন। মহান একুশের দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদার চেতনা হোক সেই লড়াইয়ের পাথেয়।

Developed by: