সর্বশেষ সংবাদ
ফেঞ্চুগঞ্জ ইউনিয়ন ছাত্রদলের কমিটি : ঘোষণা উপজেলার, বাতিল জেলার  » «   ক্রীড়া সংগঠক আব্দুল কাদিরের মায়ের ইন্তেকাল  » «   রণবীর-দীপিকা বিয়ে নভেম্বরে?  » «   যাদুকর ম্যারাডোনার পায়ের অবস্থা করুণ  » «   একটু আগেবাগেই শীতের আগমণ  » «   চট্টগ্রামে আইয়ুব বাচ্চুর জানাযা বাদ আছর  » «   রাবণ পোড়ানো দর্শনকারী ভিড়ের উপর দিয়ে ছুটে গেলো ট্রেন : নিহত ৬০  » «   গোলাপঞ্জে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন উদ্বোধন করলেন শিক্ষামন্ত্রী  » «   বিসর্জনের দিন সিলেটে আসনে ‘দেবী’  » «   বিভিন্ন পূজা মণ্ডপ পরিদর্শনে মেয়র আরিফ  » «   সিলেটে স্বয়ংক্রিয় কৃষি-আবহাওয়া স্টেশন স্থাপিত  » «   শীতে ত্বক সজীব রাখতে শাক-সবজি খান  » «   সিলেট ওসমানী বিমানবন্দর সংস্কার হচ্ছে প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে  » «   কোম্পানীগঞ্জে টাস্কফোর্সের অভিযানে পেলোডার মেশিন জব্দ  » «   ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধনে সরকারকে নোটিশ  » «  

‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ সাম্রাজ্যবাদের স্বীকৃতিতে জনগণের কোন স্বার্থ নেই



সম্প্রতি জাতিসংঘ ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ ঘোষণার পর এদেশের শাসকশ্রেণীর বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী অংশ ও বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা একে এদেশের জনগণের সংগ্রামের বিশ্ব স্বীকৃতি বলে খুব ঢাক- ঢোল পেটাচ্ছে। শাসক সরকার আরো এক ধাপ এগিয়ে একে নিজেদের কৃতিত্ব বলে জাহির করছে।
বিশ্ব-জনগণের স্বীকৃতি, আর জাতিসংঘের স্বীকৃতি এক কথা নয়। বর্তমানে জাতিসংঘ হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদীদের নেতৃত্বে তাদের ও বিশ্বজুড়ে তার দালাল গণবিরোধী শাসকদের সমন্বয়ে গঠিত, সামাজ্যবাদের স্বার্থের পাহারাদার একটি সংস্থা। আজকের বিশ্বে জাতিসংঘের তৎপরতা হচ্ছে প্রধানত সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের তৎপরতা। সুতরাং ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে জাতিসংঘ যে স্বীকৃতি দিয়েছে তাকে সাম্রাজ্যবাদের দেয়া স্বীকৃতি বললে খুব একটা বাড়িয়ে বলা হবে না।
’৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি যে ভাষা আন্দোলন এদেশে হয়েছিল তা নিঃসন্দেহেই ছিল একটা ন্যায্য, বীরোচিত ও মহান সংগ্রাম- যা তৎকালীন জাতীয় নিপীড়নকারী প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীকে গুরুতর আঘাত হেনেছিল। বাস্তবে এই ভাষা আন্দোলন ছিল এদেশের নিপীড়িত জাতি-জনগণের জাতীয় মুক্তি আকাঙ্খারই একটি প্রকাশ। কিন্তু এ আন্দোলন একদিকে যেমন ছিল ন্যায়সঙ্গত ও মহান, অন্যদিকে এতে ছিল গুরুতর সীমাবদ্ধতা। এই আন্দোলন সামগ্রিক জাতীয় মুক্তির জন্য বিপ্লবী সংগ্রামের অধীনে পরিচালিত না হয়ে একটা ইস্যুভিত্তিক সংগ্রাম আকারে চালিত হয়। এটা জাতীয় নিপীড়নের বৃহত্তর শত্রু সাম্রাজ্যবাদকে চিহ্নিত করেনি, বরং শুধুমাত্র আশু জাতীয় নিপীড়নকারী পাকিস্তানী ষড়যন্ত্রকেই আঘাত করেছিল। এভাবে এই সংগ্রাম তার তৎকালীন ন্যায্যতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব সত্ত্বেও একটি সামগ্রিক জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম, তথা একটি বিপ্লবী সংগ্রামের অংশ হয়ে ওঠেনি। এ কারণেই এ সংগ্রামের ঐতিহাসিক গুরুত্ব (পাকিস্তানি জাতীয় নিপীড়নকে বিরোধিতা করা) পার হয়ে যাবার পর সাম্রাজ্যবাদের দালাল প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদীরা একে আজ নিজেদের পকেটে পুরতে সক্ষম হয়েছে।
কিন্তু, এ সত্ত্বেও, এ সংগ্রাম যখন ছিল জীবন্ত এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসী বিদ্রোহ, তখন আর সব সংগ্রামের মতই এই বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদীরা তাতে সবচেয়ে পশ্চাৎপদ ভূমিকা রেখেছিল। বাস্তবে সে সময়ে এই আন্দোলনে তৎকালীন আঃ লীগের বুর্জোয়া প্রতিক্রিয়াশীল অং তেমন কোন জোরালো ভূমিকা রাখেনি। বরং এতে উদ্যোগী ও নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন বামপন্থী তরুণ ও কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদগণ। অথচ আজ আওয়ামী লীগ ও তার দালাল বুদ্ধিজীবীরা এই প্রকৃত ইতিহাসকেই পাল্টে দিতে চাচ্ছে। এমনকি শেখ মুজিব নাকি এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল …..এমন ডাহা মিথ্যা বক্তব্যও তারা প্রচার করছে! ৭১ সালের পর ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের সংগ্রামী ও প্রগতিশীল অস্তিত্ব ফুরিয়ে যায়- এ আন্দোলনের উপরে উল্লিখিত সীমাবদ্ধতার কারণেই। ভাষা আন্দোলনের সারবস্তুগত আকাঙ্খা- প্রকৃত জাতীয় মুক্তির আকাঙ্খা- এখনো পূর্ণমাত্রায় জীবন্ত থাকলেও উপরোক্ত কারণেই ’৭১-এর পর ভাষা আন্দোলনের আনুষ্ঠানিকতা প্রতিক্রিয়াশীল বাঙালী বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
এরা নিজেরা প্রকৃত জাতীয় মুক্তির মূল শত্রু সাম্রাজ্যবাদের দালাল। এদেশের রাজনীতি-অর্থনীতির মূল ক্ষেত্রগুলোসহ শিক্ষা-শিল্প-সংস্কৃতিরও প্রতিটি ক্ষেত্রে এদের দেশদ্রোহী চরিত্রের প্রকাশ অতি নগ্ন। পাকিস্তানী তীব্র জাতীয় নিপীড়নের সময়কালের চেয়েও অনেক ব্যাপকভাবে এখন বিজাতীয় ভাষা ইংরেজীকে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে এদেশের কোমল শিশুদের থেকে শুরু করে শিক্ষার সর্বক্ষেত্রে। ইংরেজী মাধ্যমের স্কুল-কলেজ এখন রাজধানী ছাড়িয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। এর উপর বিজাতীয় আরেকটি ভাষা আরবীকেও একেবারে নিম্নশ্রেণীর শিক্ষার্থীদের উপর চাপানোর ষড়যন্ত্র চলছে। সাম্রাজ্যবাদী-সম্প্রসারণবাদী জাতিবিরোধী, প্রগতিবিরোধী সংস্কৃতি, সিনেমা, ডিস এন্টেনা, টিভি, পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে দেশজুড়ে ক্যানসারের মত। এ সবই একুশের চেতনার বিরোধী। এসবের মূল কারণ হচ্ছে, এদেশের শাসকরা পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বড় জাতীয় নিপীড়ক সাম্রাজ্যবাদের দালাল, ’৭১-এর রাজাকার বা একুশের ভাষা আন্দোলনের শত্রুদের মতই জাতীয় বেঈমান।
অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে সংখ্যালঘু জাতিসত্ত্বাগুলোর উপর এরা তীব্র জাতিগত নিপীড়ন চালাচ্ছে- যার একটি রূপ হচ্ছে তাদের ভাষা-সংস্কৃতির উপর হামলা চালানো। সর্বোপরি এরা ক্ষুদে জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের সংগ্রামকে পুলিশ-আর্মি দিয়ে হত্যা করছে।
অথচ এই জাতিদ্রোহী শাসকশ্রেণী ও তাদের প্রত্যক্ষ/পরোক্ষ দালাল বুদ্ধিজীবীরা আজ একুশের বড় কর্তা হয়ে বসেছে। আর তাকে মদদ দিয়ে আকাশে তুলছে তাদের বিজাতীয় প্রভু, এদেশে ভাষা-সংস্কৃতি-জাতীয় বিকাশের শত্রুরা ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করে। সুতরাং এদের এই ভণ্ডামির উন্মোচন ও বিরুদ্ধাচরণেই নিহিত রয়েছে ২১-এর সংগ্রামী ও জাতীয় মুক্তির প্রকৃত তাৎপর্যকে উর্ধ্বে তুলে ধরা।
* সাম্রাজ্যবাদীরা এ সত্য খুব ভালভাবেই বোঝে যে, এই শাসকশ্রেণীর ২১-এর চেতনা তাদের জন্য কোন বিপদ নয়। বরং এটা তাদের স্বার্থের উপযুক্ত। এ কারণেই তারা এই আন্দোলনের দীর্ঘ প্রায় অর্ধ শতাব্দীকাল পরে এবং তার সংগ্রামী অস্তিত্ব ফুরিয়ে যাবার ৩০ বছর পরে যখন প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদীরা একে একটি মৃত আনুষ্ঠানিকতা ও জাতীয় শত্রুদের হাতিয়ারে পরিণত করেছে তখন তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয় বিপ্লবী সংগ্রামকে বিপথগামী ক’রে বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী পথে তাকে চালানো- যাকে সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে পথভ্রষ্ট করা ও কিনে ফেলা খুবই সহজ। ’৭১ সালে এদেশে তারা এটাই করেছিল। পরে দক্ষিণ আফ্রিকা, প্যালেষ্টাইন ও আজ পূর্ব তিমুরে এবং অন্যত্র এটাই তারা করেছে ও করছে।
* এদেশের (ও অন্য সকল নিপীড়িত দেশের) ব্যাপক জনগণের ভাষা-সংস্কৃতির বিকাশ, তথা জাতীয় মুক্তির স্বার্থ আজ নিহিত রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শোষণ-নিপীড়ন উচ্ছেদের সংগ্রামে। যদিও কোন কোন জাতিসত্ত্বার ক্ষেত্রে এর পাশাপশি আশু জাতীয় শত্রু হিসেবে অন্য শক্তিশালী জাতির বুর্জোয়া শাসকশ্রেণীর জাতীয় নিপীড়নও রয়েছে- যাকে উচ্ছেদ করতে হবে।
সাম্রাজ্যবাদের দালাল জাতীয় বিশ্বাসঘাতক আমলা-বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর পক্ষ থেকে নিজ নিজ ভাষাকে তুলে ধরার বক্তব্য একদিকে ভণ্ডামি, অন্যদিকে প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করা- যা কিনা প্রকৃত জাতীয় মুক্তিকেই বিরোধিতা করে এবং নিজ দেশে ক্ষুদে জাতিসমূহের ভাষা-সংস্কৃতি-জাতীয় মুক্তির উপর নিপীড়ন/দমন চালায়।
তাই, প্রকৃত জাতীয় মুক্তির সংগ্রামকে আজ ভাষার অধিকারের প্রশ্নকে সাথে নিয়ে সাম্রাজ্যবাদের উচ্ছেদ, তথা নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সাথে যুক্ত করতে হবে। আর, এ কর্তব্যের অপরিহার্য অংশ হচ্ছে ‘ভাষা দিবস’-এর নামে গণশত্রু ও জাতীয় বিশ্বাসঘাতক শাসকশ্রেণী ও তাদের প্রভু সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্তের মুখোশ উন্মোচন করা। নিপীড়িত জনগণের প্রয়োজন নিজ ভাষা-সংস্কৃতি বিকাশের, তথা জাতীয় মুক্তির পথে মূল শত্রু সাম্রাজ্যবাদ (ও অন্য সকল জাতীয় নিপীড়ক) উচ্ছেদের বিপ্লবী সংগ্রামের জীবন্ত কর্মযজ্ঞ; ‘আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস’-এর নামে জাতীয় শত্রুদের ভণ্ডামি, চক্রান্ত ও আনুষ্ঠানিকতাবাদী মৃত উৎসব নয়।

Developed by: