সর্বশেষ সংবাদ
রাজ-শুভশ্রী এক বাঁধনে  » «   বাংলাদেশ নতুন যুগে প্রবেশ করেছে : প্রধানমন্ত্রী  » «   আগাম বন্যার আশঙ্কা  » «   ঈদে আসছে ‘আমার প্রেম আমার প্রিয়া’  » «   বজ্রপাতে একদিনে সারাদেশে ৩০ জনের মৃত্যু  » «   জাতীয় অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামের ইন্তেকাল  » «   জাতিসংঘ মিশন : সিলেটের ২০০ স্বপ্নবাজ তরুণের নেতৃত্বে হাওরসন্তান সোহাগ  » «   বিয়ানীবাজারে বুদ্ধি প্রতিবন্ধি যুবতীকে ধর্ষণের অভিযোগে যুবক গ্রেফতার  » «   বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন সোনম কাপুর আর আনন্দ আহুজা  » «   এসএসসি ফল পুনঃনিরীক্ষন শুরু : একাদশে ভর্তি ১৩ মে থেকে  » «   ষাঁড়ের গুতোয় কৃষকের মৃত্যু  » «   পা-ই তার সাফল্যের চাবিকাটি  » «   গাছ ভেঙে পড়ায় সিলেটের সাথে রেল যোগাযোগ বন্ধ  » «   এসএসসিতে সিলেটে পাস ৭০.৪২% : জিপিএ-৫ ৩১৯১ জন  » «   নিয়োগ চলছে কামা পরিবহন (প্রা. লি.)-এ।  » «  

শওকত আলীর ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ বাংলা ভাষার অনন্য দলিল



শাফিক আফতাব:শওকত আলী বাংলা কথাসাহিত্যে শক্তিমান ও বিরলপ্রজ ঔপন্যাসিক। ষাটের দশকে বাংলা কথাসাহিত্যের ব্যাপ্ত জগতে প্রবেশ করে তিনি প্রচলিত সাহিত্যাদর্শের সমান্তরাল ধারার বিষয়ে যেমন নিয়ে আসেন অভিনবত্ব; কলাকৌশলে নিয়ে আসেন বৈচিত্র্যময় টেকনিক। কথাসাহিত্যের প্রবহমান ধারায় অঙ্গীভূত থেকে, অগ্রজদের সাহিত্যকর্মের নির্যাস আহরণ করে, সমকালীনদের মধ্যে থেকেও শওকত আলী নির্মাণ করেন আপন শিল্পভুবন। ‘৪৭-পূর্ব ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কাল, ষাটের দশকের নব্য ঔপনিবেশিকের শোষণ-পীড়ন, ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা-পরবর্তী বাঙালি জীবন, ‘৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, বিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তিযুগসহ দীর্ঘ পাঁচ দশকের বাঙালি জীবন তার উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে স্বতন্ত্র মনন ও মেজাজে। তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে জীবনকে পর্যবেক্ষণ করেন এবং নিবিড় আন্তরিকতায়, নির্মোহ দৃষ্টিতে উপন্যাসের মানব-মানবীকে সৃজন করেন। সময় ও সমাজ-বাস্তবতার নিরিখে বাঙালি জীবনের প্রদোষকাল থেকে আধুনিককাল পরিসরের বাঙালির যাপিত জীবন, বেঁচে থাকার নিরন্তর লড়াই, রাজপ্রশাসনের শোষণ-পীড়ন, কৃষিজীবী তৃণমূল মানুষের অধিকার, নাগরিক জীবনের বিকলাঙ্গ রূপ এবং গ্রামীণ জীবনের অভাজনের জীবনমথিত কান্না প্রভৃতি শিল্প বিশ্বস্ততায় চিত্রিত হয়েছে তার উপন্যাসে। তার উপন্যাস শিল্পের মধ্যে ‘প্রদোষে প্রাকৃজন’ জাতিসত্তার পরিচয়জ্ঞাপক ধ্রুপদী ধারার উপন্যাস। এটি বাংলা ভাষার অনন্য দলিলরূপে পরিগণিত। উপন্যাসটিতে প্রদোষকালের ব্রাত্যজীবনের আলেখ্য চিত্রায়ণের সমান্তরালে ঐতিহ্যপ্রীতি সফলভাবে চিত্রিত হয়েছে। এই ঐতিহ্যপ্রীতির চিত্রায়ণ করতে গিয়ে শওকত আলী উপন্যাসের পটভূমি হিসেবে নির্বাচন করেছেন প্রদোষকালের বাংলায়_ তুর্কী আক্রমণের প্রাক্কাল।
‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসের কাহিনী-কৌশলে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, মৃৎশিল্পী শ্যামাঙ্গ দেবীপীঠে ব্রাত্যমূর্তি নির্মাণ করায় গুরু বসুদেবের গৃহ থেকে বিতাড়িত হয়ে উজুবটে শুকদেবের বাড়িতে আশ্রয় পায় এবং মায়াবতী ও লীলাবতীর সাক্ষাৎসূত্রে প্রথম দর্শনেই লীলাবতীর সঙ্গে প্রণয়াসক্ত হয়ে পড়ে। মায়াবতীর অনুরোধক্রমে বসন্ত দাসকে অনুসন্ধান সূত্রে নবগ্রাম হাটে উপনীত হলে শ্যামাঙ্গ রাজা হরিসনের সৈন্যের হাতে সর্বস্ব হারিয়ে কুসুম্বী গ্রামে এক কুম্ভকারের ঘরে আশ্রয় পায়। এদিকে উজুবটে বসন্ত দাস আগমন করে এবং রাজা হরিসনের শোষণ, প্রজাপীড়ন, শ্রেণিভেদ থেকে পরিত্রাণের উপায় হিসেবে বন্ধু ভিক্ষু মিত্রানন্দের সন্ধান করতে থাকে। এদিকে যবনদের আক্রমণ, সামন্ত ও মহাসামন্ত শোষণ এবং প্রজাপীড়নের ঘটনা জনৈক যোগীর কাছে শ্যামাঙ্গ জানতে পেয়ে পুনরায় শুকদেবের বাড়িতে হাজির হয়। ইতিমধ্যে রাজা হরিসনের সৈন্যরা শুকদেব ও লীলাবতীদের বাড়ি জ্বালিয়ে দিলে প্রাণ রক্ষার্থে শ্যামাঙ্গ লীলাবতীকে নিয়ে আত্মগোপনের চেষ্টা করে। এদিকে বসন্ত দাস মিত্রানন্দকে পুনর্ভবার পশ্চিম তীরে সন্ধানসূত্রে বিচিত্র পথ মাড়িয়ে ছায়াবতীর মন্দিরে গিয়ে হাজির হয় এবং মিত্রানন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে মিত্রতার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে আসন্ন সন্তানের আগমনে স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করে। ওদিকে শ্যামাঙ্গ ও লীলাবতী শিলনাথের বাড়ি থেকে মাতুল সিদ্ধপার আদেশে পলায়নকালে ডাকাতদের কবলে পড়ে যবনকেন্দ্রে নীত হয়। লীলাবতী প্রাণ রক্ষার্থে যবন ধর্ম গ্রহণ করলেও শ্যামাঙ্গ উত্তরাধিকারের বহমান ঐতিহ্য রক্তের ঋণ বিস্মৃত হতে পারে না। ফলে যবন ধর্ম গ্রহণ থেকে বিরত থাকে। অবশেষে লীলাবতীর স্বামী শ্যামাঙ্গ সামন্ত হরিসনের সৈন্য অভিমন্যু দাসের হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়।

উপন্যাসের এই ঘটনাক্রমের সমান্তরালে জনমানুষের পলায়নপরতা, রাজশোষণ, প্রজাপীড়ন, ব্রাত্য জীবনধারার চালচিত্র প্রভৃতি ঘটনা কাহিনীর অনুষঙ্গ হয়েছে। ঔপন্যাসিক প্রদোষকালের মানুষের প্রাণ রক্ষার্থে পলায়নপরতার সঙ্গে সামন্ত-মহাসামন্ত শোষণ, পীড়ন, বিলাস, রাষ্ট্রীয় বিশৃঙ্খলা, শ্রেণিভেদ, ভিক্ষুদের পতিত জীবনযাপন, যবনদের আক্রমণ ও বাণিজ্য, ব্রাত্য-শূদ্রশ্রেণির মূক জীবনযাপন ও বেঁচে থাকার নিরন্তর লড়াইয়ের চিত্র প্রযুক্ত করেছেন। উপন্যাসের কাহিনীসূত্র অনুসন্ধান-কৌশলে দেখা যায়, শওকত আলী যখন সাহিত্যাঙ্গনে আবির্ভূত হন, তখন স্বৈরাচার আইয়ুব খান সিংহাসনে অধিষ্ঠিত। স্বৈরশাসক মানুষের শুধু বাকস্বাধীনতা হরণ করেনি; মানুষের শিল্পচর্চায় বিধিনিষেধও আরোপ করে। এর উপায় হিসেবে আইয়ুব রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ, ইসলামী আদর্শের সাহিত্য রচনায় পৃষ্ঠপোষকতা ও উদ্বুদ্ধকরণ_ এক কথায় শিল্প রচনায় বিধিনিষেধ আরোপ করেন। এ কারণে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে উপনীত দেশের মানুষ। মুক্তিযুদ্ধে আবার ঘরছাড়া মানুষের পলায়নপরতা। এসব বিচিত্র ঘটনা কোনো লেখকের যাপিতজীবনে রেখাপাত করে। যার ফলে দেখা যায়, সমকাল দ্বারা শওকত আলী ভীষণভাবে সংক্ষুব্ধ। এই সংক্ষুব্ধতা তাকে শিল্প নির্মাণে উদ্বুদ্ধ করেছে। এ উপন্যাসের নায়ক চরিত্র-সৃজন কৌশলে দেখা যায়, লেখকের সমকালীন অবরুদ্ধ পরিবেশ ও মূক সময়ের চিত্রায়ণ ঘটেছে। স্বৈরাচার আইয়ুব খান ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তথাকথিত ‘মৌলিক গণতন্ত্রী’ প্রণয়ন করে এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রতাপ প্রদর্শন করে_ রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধসহ ‘সাহিত্য সংঘ’ গঠন করে প্রখ্যাত নাট্যকার মুনীর চৌধুরীকে দিয়ে ইসলামী ভাবাদর্শ ও ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার অভিপ্রায়ে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের ঘটনা নিয়ে ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ নাটক লিখিয়ে নেয়। এই যে শিল্পচর্চায় বাধানিষেধ আরোপ তা মূলত শিল্পীর স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করার শামিল। সামাজিক কমিটমেন্ট নিয়েই শওকত আলীর সাহিত্যাঙ্গনে আবির্ভাব। এই কারণে আইয়ুব সরকারের বাঙালির শিল্পচর্চা ও ঐতিহ্য হরণের একনায়কতান্ত্রিক মানসিকতায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন। শিল্পের এই অপমান লেখকের পক্ষে সহ্য করা অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। কালে কালে শিল্পীরা কি এভাবেই নিগৃহীত, নির্যাতিত হয়? লেখক শিল্পের শিকড় সন্ধানে প্রলুব্ধ হন এবং সমকাল থেকে আটশ’ বছর পূর্বে প্রাকৃতজনের প্রদোষকালে ফিরে গিয়ে রাজনৈতিক আবহে শ্যামাঙ্গ নামক মৃৎশিল্পীর জীবনকে নির্বাচন করেন। তাকে নায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ করে তার শিল্প-অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। শ্যামাঙ্গ শোষিত নির্যাতিত ব্রাত্যজনের প্রতিভূ। কাল থেকে কালান্তরের বোধ ও চেতনা। ঔপন্যাসিক তাকে বোধে ও দ্রোহে প্রকৃত শিল্পীরূপে নির্মাণ করেছেন। প্রকৃত শিক্ষার কাছে সে আপসহীন এমনকি গুরুকে পরিত্যাগ করতে তার গ্গ্নানি নেই। তার প্রমাণ পাই, শ্যামাঙ্গ গুরু বসুদেবকে যখন কোনোক্রমেই সে আর বোঝাতে পারে না, তখন সে যথার্থ সম্মান প্রদর্শন করে গুরুকে কটুবাক্য শোনায় :
‘গুরুদেব, আপনি যদি সত্যি সত্যিই আমাকে পরিত্যাগ করে থাকেন, তাহলে শুনে রাখুন, আমিও আপনাকে পরিত্যাগ করলাম_ শুধু আপনাকে নয়, আপনার প্রদত্ত শিক্ষাকেও’ (প্রদোষে প্রাকৃতজন, পৃষ্ঠা-১৫)
সাহিত্য গবেষক অনেকেই মনে করেন, ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’-এর ভাষা তুর্কী আগমনের সময়কালের। অবশ্য লেখকের মন্তব্যও তাই। সংস্কৃতবহুল ও সমাসবদ্ধ শব্দ প্রয়োগে এ উপন্যাসের যে বাক্যগঠন প্রণালি তাতে ভাষা বিদগ্ধ ধ্রুপদী ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ প্রাবন্ধিক বলে মনে হয়। সর্বোজ্ঞ লেখক পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করতেই পারেন। তবে এ উপন্যাসের ভাষা লক্ষ্মণ সেনের আমলের বলে অনেক গবেষক মনে করলেও মূলত তা বিদ্যাসাগরীয় যুগের বলে মনে হয়। কেননা, আমরা জানি গদ্যের জনক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিদ্যাসাগরীয় গদ্যে যে সাবলীলতা ও প্রাঞ্জলতা প্রতিভাত, তাই রূপান্বিত ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’-এর গদ্যে। আবার গদ্যের উৎপত্তির বিকাশ টানলে আমরা দেখতে পাই ১৮০১ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে গদ্যের সূচনা হলেও এর প্রথম সূচনা ধরা হয় ১৫৫৫ সালে কুচবিহারের রাজা নরনারায়ণের চিঠিতে। প্রথম গদ্যের নমুনা পাওয়ার সাল ১৫৫৫ ধরা হলে দ্বাদশ শতকের বাংলায় লিখিত কোনো গদ্য ছিল না। যদি না থাকে তবে ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’-এর গদ্য দ্বাদশ শতকের নয়, অর্থাৎ প্রদোষের কাহিনী সমকালীন নয় বা তা লক্ষ্মণ সেনের আমলের নয়। তখন বাংলা গদ্যের উৎপত্তিই হয়নি। এই উপন্যাসের গদ্য বিদ্যাসাগরীয় রীতির গদ্য।

ভাষা ব্যবহারে কিছু অসঙ্গতি নজরে আসে। আমরা জানি, মৃৎশিল্পী শ্যামাঙ্গ গুরু বসুদেবের গৃহে মূর্তি নির্মাণ ব্যতীত অন্য কোনো বিদ্যাভ্যাস করেনি এবং তার শিক্ষালাভের কোনো বার্তা ঔপন্যাসিক আমাদের জানান না। আমরা দেখেছি ঔপন্যাসিক এ উপন্যাসে প্রদোষকালের প্রাকৃতজনের জীবন ও তাদের সংগ্রামকে ধারণ করার চেষ্টা করেছেন। প্রাকৃতজনরা মূলত বাঙালির প্রদোষকালের কথা বলে। প্রাকৃতজন বা ব্রাত্য জনগোষ্ঠী একান্তই নিম্নশ্রেণিভুক্ত। তাদের ভাষাও হওয়ার কথা আঞ্চলিক। বিশেষ করে তাদের মুখনিঃসৃত কথামালা। কিন্তু ঔপন্যাসিক তাদের মুখে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা মান বা প্রমিত ভাষায় রূপান্তরিত। আমরা জানি, বাংলা ভাষা তখন পর্যন্ত পরিপুষ্টতা পায়নি। তাহলে ব্রাত্য মানুষরা কীভাবে এই রকম ধ্রুপদী ভাষায় কথা বলে? বলা যায়, ভাষা ব্যবহারে শওকত আলী এ উপন্যাসে অগাধ পাণ্ডিত্য প্রদর্শনে সক্ষম হলেও নিম্নবর্গের ভাষা বলে তা বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। তথাপি সংস্কৃত ও সমাসবদ্ধ শব্দের বহুল ব্যবহার প্রদোষের ভাষাকে করেছে দ্যুতিময় ।

‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’কে কেউ বলেন ঐতিহাসিক উপন্যাস, কেউ বলেন ইতিহাসাশ্রিত। আবার কেউ বলেন ঐতিহ্য ও মিথপ্রধান উপন্যাস। গবেষক ও সমালোচকের অভিমত কোনোটাই খণ্ডন ভিত্তিহীন নয়। এসবের সংজ্ঞায়নের বাইরে এটাকে নিম্নবর্গের জীবনচেতনাভিত্তিক উপন্যাসও বলা য়ায়। কেননা, আমরা দেখেছি লেখক মূলত এ উপন্যাসে নিম্নবর্গের জীবনকেই উপন্যাসের বিষয় করেছেন। উপন্যাসের নায়ক-নায়িকা, পার্শ্বচরিত্রগুলো মৃৎশিল্পী, কুম্ভকার, ক্ষেত্রকর, ডোম, কর্মকার, তন্তুবায়, চণ্ডাল প্রভৃতি। এসব মানুষ নিম্নবিত্তের পর্যায়ভুক্ত। এদের জীবনধারা ও বেঁচে থাকার সংগ্রামকেই লেখক উপন্যাসের উপজীব্য করেছেন। উচ্চবিত্তের রাজা সামন্ত হরিসন, শক্তিবর্মণ, সোমজিৎ উপাধ্যায়গণ উপন্যাসে বিচরণ করলেও নিম্নবর্গ ও শূদ্রশ্রেণির ওপর তাদের শোষণ-পীড়ন অঙ্কিত।
এসব কারণে আমরা এ উপন্যাসকে নিম্নবিত্তের জীবনচেতনাভিত্তিক উপন্যাস বলতে পারি। কিন্তু নিম্নবিত্তের জীবনচেতনাই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় আবহ হয়নি। তৎকালীন মানুষের গার্হস্থ্য জীবনধারা, শিল্প নির্মাণ, বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান, পেশা, সাংস্কৃতিক চিত্র প্রভৃতি বিষয়ও নিপুণভাবে লেখক পরিবেশন করেছেন। ইতিহাসের যে ঘটনা তা চরিত্রের ব্যক্তিজীবনে সনি্নহিত করে লেখক একটা সময়কে ধারণ করার কৌশল গ্রহণ করেছেন। এই যে পূর্ব-পুরুষের জীবনধারা, লোকাচার, কিংবদন্তি, স্মৃতি-কল্পনা_ এই বিষয়গুলো কোনো জাতীয় ঐতিহ্যকে ইঙ্গিত করে। এদিক থেকে এই উপন্যাসটিকে ঐতিহ্যপ্রধান উপন্যাসও বলা যায় । আবার ইতিহাসের ঘটনা থাকলেও চরিত্রগুলো লেখকের সৃষ্ট। ফলে ইতিহাসের ছাপচিত্র নিয়ে লেখা উপন্যাসকে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলা যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয় না। আবার নিম্নবিত্তের জীবনাঙ্কনই লেখকের মূল লক্ষ্য বলে মনে হয় না। ইতিহাস, সমাজ, শিল্প, সংস্কৃতি, লোকাচার, পেশা_ সব মিলেমিশে একটি জাতির আত্মমুকুর হয়ে উঠেছে এ উপন্যাসটি। ফলে সব তর্ক ঝেড়ে ফেলে বলতে চাই, ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ বাঙালি ঐতিহ্যপ্রধান উপন্যাস। বাংলা ভাষা ও বাঙালির জাতিসত্তার পরিচয় উদ্ঘাটনে বাংলা উপন্যাস শিল্পে যে ক’টি উপন্যাস প্রতিনিধিত্ব করবে তন্মধ্যে প্রদোষে প্রাকৃতজন অনন্য। ঔপন্যাসিকের শিল্পমেধার কারণে এটি বাংলা ভাষার অনন্য দলিল হয়ে উঠেছে।

Developed by: