সর্বশেষ সংবাদ
ঈদের ছবি নিয়ে হিসাব-নিকাশ এখনো মিলছে না  » «   ১১ প্রশ্নে ৮২ ভুল!  » «   মেয়েদের সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ ফুটবল : আরেকটা হাতছানি  » «   ২ সেপ্টেম্বর শাবিতে ভর্তির আবেদন শুরু  » «   এ্যাকশনে পুননির্বাচিত আরিফ  » «   ঈদের আগে খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করেছে বিএনপি  » «   সমকাল সম্পাদককে শেষ শ্রদ্ধা  » «   অনবদ্য তামিম ইকবাল  » «   ওরা এখনো নজরকাড়া  » «   শাবিপ্রবি’র হল বন্ধ  » «   সিলেটে ২১ আগষ্ট থেকে ৫ দিন বন্ধ বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার রিচার্জ  » «   ইকুয়েডরে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত  » «   ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন হ্যাক করা অত্যন্ত সহজ!  » «   সারা’র রুপে মুগ্ধ সবাই  » «   আবারও সিলেটে অনুষ্ঠিত হবে বঙ্গবন্ধু কাপ  » «  

আসাদ্দর আলী একজন কবি সাহেবের স্মৃতিঃ



মো আবুল বশর  : মুক্তির মন্দির সোপান তলে
কত প্রাণ হলে বলিদান,
লেখা আছে অশ্রুজলে।
কত বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙ্গা
বন্দিশালার ঐ শিকলভাঙ্গা
তারা কি ফিরিবে আর সুপ্রভাতে?
যত তরুণ অরুণ গেছে অস্তাচলে।
আমাদের সমাজ পরিবর্তনের ইতিহাসে, রাজনীতি-ইতিহাস-সভ্যতার পথ পরিক্রমায় অনেক জ্ঞানীগুণী মহৎপ্রাণ ব্যক্তি আপন বিভায়, আপন মহিমায় কাব্যে সাহিত্যে ইতিহাসে তাদের অবস্থান নির্ণয় করে থাকেন, কিন্তু আসাদ্দর আলীদের এবং তার মত আরো অনেক নেতাকর্মী তাদের জীবনব্যাপী ত্যাগ দিয়ে, শ্রম দিয়ে এদেশের মেহনতী মানুষের জন্যে সংগ্রাম করে গেছেন, একটি সুখী সুন্দর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে গেছেন, তাদের কথা আমাদেরই লিখতে হবে।
বাংলাদেশের অসংখ্য খ্যাত-অখ্যাত গ্রামের মধ্যে সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার তাজপুর ইউনিয়নের কাজিরগাঁও নামে এক গ্রামে ১৯২৫ সনে আসাদ্দর আলীর জন্ম। সাধারণ নিয়মে গ্রামের স্কুলেই প্রাথমিক শিক্ষার পাঠগ্রহণ এবং তাজপুর মঙ্গলচন্ডি (নিশিকান্ত) হ্স্কাুলে’ উচ্চশিক্ষার পাঠগ্রহণ। তারপর স্কুলের শিক্ষার পালা শেষ করে সিলেট আগমণ এবং এম.সি কলেজে ভর্তি এবং উচ্চশিক্ষা স্নাতক শ্রেণী পর্যন্তই। এ সময়েই চিন্তা চেতনার উন্মেষ। পেয়ে যান পীর হবিবুর রহমান, তারা মিয়া এবং এ এইচ শাহাদত খান প্রমুখের সান্নিধ্য, রাজনৈতিক চিন্তা চেতনার উন্মেষ এবং রাজনীতিতে সমর্পণ, স্বপ্ন দেখার সূত্রপাত একটা সুখী সমৃদ্ধ দেশ গড়ার। ১৯৪৭-এ দেশ ভাগ হলে। তখন ছাত্র সংগঠন ছিল আসাম প্রাদেশিক মুসলিম ছাত্র ফেডারেশন, ১৯৪৮-এ ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত। ১৯৫০ -এ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দাঙ্গা প্রতিরোধে শান্তি কমিটি গঠন, ১৯৫১ -এ অসাম্প্রাদায়িক ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন’ গঠন, ৫২-ও ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন এবং তারপর স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলন। সকল আন্দোলন ও সংগ্রামে আসাদ্দর নিবেদিত প্রাণ কর্মী হিসেবে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন। এসময়ই তিনি মার্কসীয় দর্শন, সাহিত্য ইত্যাদি প্রচুর পড়াশুনা করেন এবং মার্কসবাদ-লেনিনবাদে দীক্ষা গ্রহণ এবং ১৯৪৯ সালে গোপন পার্টীর সদস্যপদ লাভ করেন এবং কৌশলগত কারনে কখনো আওয়ামীলীগ, ন্যাশনাল অওয়ামী পার্টী (ন্যাপ), জাতীয় গণমুক্তি ইউনিয়ন, সাম্যবাদী দল প্রভৃতি বিভিন্ন প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলে অংশগ্রহণ করে দায়িত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। আদতে তিনি ছিলেন কমিউনিষ্ট পার্টির লোক। ১৯৪৯ সনে তিনি কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ করেছেন এবং আমৃত্যু সাধারণ মেহনতী মানুষের সার্বিক মুক্তির স্বপ্ন দেখেছেন, সে লক্ষ্যে কাজ করে গেছেন। সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব ও কমিউনিস্ট পার্টির বিভক্তিতে তিনি মর্মাহত হয়েছিলেন, কিন্তু চীন পন্থি বলে তিনি পরিচিত ছিলেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও তিনি অবদান রেখেছেন দু’বার তিনি চীন ভ্রমণ করেছেন এবং চীন ও রাশিয়ার মধ্যে যে আদর্শগত ফাটল দেখা দেয় তা নিরসন করতে তিনি প্রচেষ্টা নেন এবং এ বিভেদ ও অনৈক্য তাকে খুব মর্মাহত করে।
মানুষের জীবন বহুবিধ গুণের সমন্বয়ে গঠিত কিন্তু একজীবনে কি কোন লোকের প্রতিভার সবগুলি দিক বিকশিত হয়ে উঠে, নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার কারণে তা সম্ভবপর হয়ে উঠে না। কমরেড আসাদ্দর আলীও ছিলেন একজন মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক পন্ডিত। মার্ক্সসীয় দর্শন ও সাহিত্যে ছিল তার গভীর পড়াশুনা যার দরুন তিনি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। ডাক্তারী পেশায় ও তার নাম যশ ছিল। তাছাড়া তিনি কবি সাহেব হিসেব নামে পরিচিত মহলে সর্বাধিক পরিচিত ছিলেন। ছোটগল্প ও সাহিত্যেও অন্যান্য অঙ্গনেও সহজ বিচরণ ছিল বলে জানা যায়। কিন্তু রাজনীতিতে একান্ত সমর্পণের দরুণ তার প্রতিভার এদিকটি তেমন বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায় নি, আর তিনি লোকটিও ছিলেন নিভৃতচারী। কিন্তু ঘরোয়া আসর বৈঠকে তার ধীর শান্ত চেহারা নিয়ে উজ্জ্বল উপস্থিতি আমাদের মুগ্ধ করত, মুগ্ধ করত তার বুদ্ধিদীপ্ত কথা ও আলাপচারিতা। কমরেড আসাদ্দর আলীকে কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে আগে থেকেই জড়িয়ে পড়েছিলাম। উনিশ শ পঞ্চাশ সনে মেট্রিক পাশ করার পরপর সান্নিধ্য লাভ করি পীর হবিবুর রহমান, তারা মিয়, আসাদ্দর আলী, এ.এইচ শাহাদত খান প্রমুখের। দেশ বিভাগের আগে ও পরে জনশক্তি’, অফিস ছিল জিন্দাবাজারের কাঠের দু’তালা ঘরে। সেখানেই স্থাপিত সাপ্তাহিক ‘নওবেলালের’ অফিস। তার নীচের দিকে ক্ষুদে একচিলতে ঘরে আমরা বসতাম, তাছাড়া গোবিন্দচরণ পার্কেও বেঞ্চগুলি তখন বসার উপযোগী ছিল।তদুপরি সুরমার ওপারে স্টেশন রোডস্থ সৈয়দ মোতাহার আলী সাহেবের ছোট বিস্কুটের দোকান ছিল, সেখানে মাঝে মধ্যে মিলিত হতাম। এসব বৈঠকে পীর হবিবুর রহমান, আসাদ্দর আলী, তারা মিয়া, মতছির আলী ও আরো অন্যান্যরা সমবেত হতেন। সমসাময়িক দেশ হালচাল, সমাজ, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং রাজনীতি ছিল আলোচ্য বিষয় এবং এসব ঠৈক আলাপচারিতা থেকে আমরা ধীরে ধীরে প্রগতিশীল চিন্তা চেতনা ও রাজনীতিতে দীক্ষা লাভ করে থাকি, যদিও জীবিকার তাগিদে জীবন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়। কিন্তু চিন্তা-চেতনা ও মনমানসিকতার কোনদিনও কোন পরিবর্তন হয়নি। এসব বৈঠক আসরে আসাদ্দর আলীর ধীর গম্ভীর উজ্জ্বল উপস্থিতি দৃষ্টি আকর্ষণ করত এবং আমার মনে পড়ে এসব কোন এক বৈঠকে আসাদ্দর আলী সকলের অনুরোধে একটি কবিতা পাঠ করে শুনান।
আমার স্মৃতিতে আসাদ্দর আলীর শান্ত-সৌম্য চেহারা, ধীর স্থির মৃদুভাষী, মিষ্টি কথাবার্তা চিরদিন উজ্জ্বল জাগরুক রয়েছে। জননেতা আব্দুল হামিদ, পীর হবিবুর, তারা মিয়া, আসাদ্দর আলী, এ.এইচ শাহাদত খান প্রমুখের তিরোধানের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক চরিত্রের একটি ধারার অবসান হয়ে গেছে। সহজ, সরল অনাড়ম্বর জীবনযাপন, নির্লোভ, আদর্শবাদেও জন্যে সমর্পিত জীবন, মেহনতী, নিপীড়িত, নির্যাতিত মানুষের মুক্তি কামনায় সমর্পিত হওয়া আজকের দিনে বড় দুর্লভ। আজকের রাজনীতির ডামাডোলের দিনে আসাদ্দর আলীকে গভীর শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করছি।

Developed by: